উপনিবেশিকরণ একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক শোষণ ও লাভের উদ্দেশ্যে এক দেশ অন্য দেশকে নিজের দখলে আনে। দখলকৃত দেশটি দখলকারী দেশের উপনিবেশ-এ পরিণত হয়। বাংলা প্রায় দুইশ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭) ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনাধীনে ছিল।
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ছিল ধনসম্পদে পূর্ণ একটি অঞ্চল। ফলে ইংরেজ আগমনের অনেক আগে থেকেই এখানে বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের আগমন ঘটে।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক: মৌর্য সম্রাট অশোক উত্তর বাংলা দখল করেন। পুণ্ড্রনগর হয় মৌর্যদের প্রদেশ।
চার শতক: উত্তর বাংলা ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।
সপ্তম শতক: শশাঙ্ক প্রথম বাঙালি শাসক হিসেবে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় 'বঙ্গ' নামে আরেকটি স্বাধীন রাজ্য গড়ে ওঠে।
অষ্টম শতক: বাঙালি পাল রাজারা প্রায় চারশো বছর বাংলা শাসন করেন।
একাদশ শতক: সেন রাজারা (দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আগত) বাংলার সিংহাসন দখল করেন।
১২০৪-১২০৬: ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি রাজা লক্ষণসেনকে পরাজিত করে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন।
১৩৩৮: ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ দিল্লির সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
১৫৩৮ সালে স্বাধীন সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে। মোগল সম্রাট হুমায়ুন ১৫৩৮ সালে গৌড় (লখ্নৌতি) দখল করলেও আফগান শাসক শের খান তাঁকে বিতাড়িত করেন। পরবর্তীতে সম্রাট আকবরের সময় ১৫৭৬ সালে পশ্চিম ও উত্তর বাংলার অনেকাংশ মোগলদের অধীনে আসে।
পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) সহজে মোগলরা দখল করতে পারেনি। বারোভূঁইয়া-রা (যাদের নেতা ছিলেন ঈশা খাঁ) একযোগে মোগল আক্রমণ প্রতিহত করেন। ১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঈশা খাঁকে পরাজিত করে ঢাকা অধিকার করেন এবং এর নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। মোগল শাসন চলে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত।
১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা সমুদ্রপথে দক্ষিণ ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছান। এর মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ক্রমান্বয়ে এই প্রতিযোগিতায় শামিল হয়।
সর্বপ্রথম আগমন। বাংলার সিল্ক ও মসলা ছিল প্রধান আকর্ষণ।
কাশিমবাজারে সিল্ক ফ্যাক্টরিতে কখনো কখনো ৭০০-৮০০ লোক নিয়োগ করত (বার্নিয়ের-এর বর্ণনা)।
১৬৯০ সালে জব চার্নক ১২০০ টাকায় কলকাতা, সুতানটি ও গোবিন্দপুর ক্রয় করেন। ক্রমশ অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় এগিয়ে যায়।
চন্দননগর, চুঁচুড়া, কাশিমবাজার প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে।
নবাব আলিবর্দি খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় নাতি সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২২ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন (১৭৫৬)। তাঁর সামনে ছিল একাধিক চ্যালেঞ্জ:
অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চক্রান্ত এবং তরুণ অনভিজ্ঞ নবাবের অপারগতা।
দেশীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শক্তির অভাব, অন্যদিকে ইংরেজদের উত্তরোত্তর ক্ষমতা বৃদ্ধি।
ইংরেজদের উন্নত সামরিক শক্তি, রণকৌশল ও নেতৃত্ব।
অর্থনৈতিক শোষণের শিকার প্রজাদের সাথে শাসকদের দূরত্ব। নবাব-ইংরেজ দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষ ছিল নির্বিকার।
মীর জাফরের উত্তরসূরী মীর কাসিম-এর পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার শাসন ক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের হস্তগত হয়।
বক্সারের যুদ্ধের পর মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ও কোম্পানির গভর্নর রবার্ট ক্লাইভের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। ক্লাইভ বাংলার নবাবের উপর শাসন ও বিচারবিভাগের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন কোম্পানির উপর। একেই দ্বৈতশাসন বলা হয়।
অতিরিক্ত করের চাপে জনগণের নাভিশ্বাস ওঠার সময় দেশে পরপর তিন বছর অনাবৃষ্টি হয়। ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬) বাংলায় নেমে আসে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। লাখ লাখ লোক অনাহারে মারা গেলেও কোম্পানি করের বোঝা কমানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এই দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোকের মৃত্যু হয়েছিল। ইতিহাসে এটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।
১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনে বাংলায় ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলের হাতে ভূমি রাজস্বব্যবস্থা অর্পণ করা হয়।
ব্রিটিশদের অনুগত জমিদার শ্রেণি তৈরি করা হয়।
মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় প্রশাসনিক দপ্তর, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতাকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ঘোষণা করেন।
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ও লর্ড হার্ডিঞ্জ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সূচনা করেন। সতীদাহ প্রথা ও বাল্যবিবাহ রোধ এবং বিধবা বিবাহ প্রবর্তনে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে সহযোগিতা দেওয়া হয়।
১৭৭৩ সালের পর থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নরদের পদবি হয় গভর্নর জেনারেল। উল্লেখযোগ্য গভর্নর জেনারেল:
১৮৫৭ সালে ইংরেজ অধ্যুষিত ভারতের বিভিন্ন ব্যারাকে সিপাহিদের মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ইংরেজরা উন্নত অস্ত্র ও চাতুর্যের মাধ্যমে এই বিদ্রোহ দমন করে। ১৮৫৮ সালের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারত শাসন আইন পাস হয়, যার মধ্য দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতের শাসনভার নিজ হাতে গ্রহণ করে।
ইংরেজরা তাদের শাসন পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে দেশীয়দের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত একটি অনুগত শ্রেণি তৈরি করতে মনোযোগ দেয়। কিন্তু আধুনিক শিক্ষার সংস্পর্শে এসে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন চেতনার স্ফুরণ ঘটে।
সমাজ সংস্কারক। সতীদাহ প্রথা রোধ ও আধুনিক শিক্ষার প্রসারে অবদান।
বিধবা বিবাহ প্রবর্তন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ।
অবাধ মুক্তমনে জ্ঞানচর্চার ধারা তৈরি করেন।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আধুনিক জ্ঞানচর্চায় অবদান।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ।
বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক অবদান।
ভাইসরয় লর্ড কার্জন ১৯০৩ সালে প্রস্তাব রাখেন যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাকে দুইভাগে ভাগ করা হবে। ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন প্রদেশ 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' গঠন। বস্তুত এর লক্ষ্য ছিল বাংলায় ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে বিভক্ত করা এবং হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাঙন ধরানো।
প্রথম দিকের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন।
ব্রিটিশবিরোধী প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। নেতৃত্ব দেন মঙ্গল পান্ডে ও হাবিলদার রজব আলী। যোগ দেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, তাঁতিয়া টোপি ও বাহাদুর শাহ জাফর।
বিলেতি পণ্য ও শিক্ষা বর্জন, দেশীয় পণ্য ও শিক্ষা প্রচলন।
ব্রিটিশ পণ্য বর্জন ও স্বশাসনের দাবি।
যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির মতো বিপ্লবী সংগঠন গড়ে ওঠে। বিপ্লবীদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (প্রথম নারী শহিদ)।
জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন নেতাজি সুভাষ বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শের-ই-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক।
১৯৪০ সালে লাহোরে শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাগুলো নিয়ে রাষ্ট্রসমূহ গঠনের কথা বলা হয়।
লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়, যার ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুশ বছরের ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটে।
ভারত বিভক্তির সাথে সাথে বাংলাও দুটি ভাগে বিভক্ত হয়:
মুসলমান সংখ্যাগর্ষ্ঠ → পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয় (পরবর্তীতে বাংলাদেশ)।
হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ → ভারতের সাথে যুক্ত হয়।