প্রথম অধ্যায়

উপনিবেশিক যুগ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম

পাঠক্রম

পাঠ ১: বাংলায় উপনিবেশিক শাসন

উপনিবেশ কী?

উপনিবেশিকরণ একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক শোষণ ও লাভের উদ্দেশ্যে এক দেশ অন্য দেশকে নিজের দখলে আনে। দখলকৃত দেশটি দখলকারী দেশের উপনিবেশ-এ পরিণত হয়। বাংলা প্রায় দুইশ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭) ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনাধীনে ছিল।

বাংলার রাজনৈতিক পটভূমি

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ছিল ধনসম্পদে পূর্ণ একটি অঞ্চল। ফলে ইংরেজ আগমনের অনেক আগে থেকেই এখানে বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের আগমন ঘটে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগ

খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক: মৌর্য সম্রাট অশোক উত্তর বাংলা দখল করেন। পুণ্ড্রনগর হয় মৌর্যদের প্রদেশ।

চার শতক: উত্তর বাংলা ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।

সপ্তম শতক: শশাঙ্ক প্রথম বাঙালি শাসক হিসেবে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় 'বঙ্গ' নামে আরেকটি স্বাধীন রাজ্য গড়ে ওঠে।

পাল ও সেন যুগ

অষ্টম শতক: বাঙালি পাল রাজারা প্রায় চারশো বছর বাংলা শাসন করেন।

একাদশ শতক: সেন রাজারা (দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আগত) বাংলার সিংহাসন দখল করেন।

মুসলিম শাসন

১২০৪-১২০৬: ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি রাজা লক্ষণসেনকে পরাজিত করে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন।

১৩৩৮: ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ দিল্লির সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

গুরুত্বপূর্ণ: সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি 'শাহ-ই-বাঙ্গালা' ও 'শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান' উপাধি ধারণ করেন। স্বাধীন সুলতানি আমলের আরেক উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, যিনি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শিল্প-সাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মোগল যুগে বাংলা

১৫৩৮ সালে স্বাধীন সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে। মোগল সম্রাট হুমায়ুন ১৫৩৮ সালে গৌড় (লখ্নৌতি) দখল করলেও আফগান শাসক শের খান তাঁকে বিতাড়িত করেন। পরবর্তীতে সম্রাট আকবরের সময় ১৫৭৬ সালে পশ্চিম ও উত্তর বাংলার অনেকাংশ মোগলদের অধীনে আসে।

পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) সহজে মোগলরা দখল করতে পারেনি। বারোভূঁইয়া-রা (যাদের নেতা ছিলেন ঈশা খাঁ) একযোগে মোগল আক্রমণ প্রতিহত করেন। ১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঈশা খাঁকে পরাজিত করে ঢাকা অধিকার করেন এবং এর নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। মোগল শাসন চলে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত।

১৭৫৭
পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে মোগল শাসনের অবসান ও ইংরেজ শাসনের সূচনা।

পাঠ ২: বাংলায় ইউরোপীয়দের আগমন ও বাণিজ্য বিস্তার

ভাস্কো-দা-গামা ও ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন

১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা সমুদ্রপথে দক্ষিণ ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছান। এর মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ক্রমান্বয়ে এই প্রতিযোগিতায় শামিল হয়।

বিভিন্ন ইউরোপীয় কোম্পানি

পর্তুগিজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

সর্বপ্রথম আগমন। বাংলার সিল্ক ও মসলা ছিল প্রধান আকর্ষণ।

ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (হল্যান্ড)

কাশিমবাজারে সিল্ক ফ্যাক্টরিতে কখনো কখনো ৭০০-৮০০ লোক নিয়োগ করত (বার্নিয়ের-এর বর্ণনা)।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

১৬৯০ সালে জব চার্নক ১২০০ টাকায় কলকাতা, সুতানটি ও গোবিন্দপুর ক্রয় করেন। ক্রমশ অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় এগিয়ে যায়।

ফরাসি ও ডেনিশ কোম্পানি

চন্দননগর, চুঁচুড়া, কাশিমবাজার প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে।

মূল তথ্য: বাণিজ্যিক উদ্যোগ ও কূটকৌশলে পারদর্শী হওয়ার কারণে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানির তুলনায় প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়। তারা বাংলায় কুঠি, কারখানা তৈরি ও সৈন্য রাখার অধিকার লাভ করে। পলাশি যুদ্ধের আগে এবং মীর জাফর ও মীর কাসিমের আমলে বাংলার প্রচুর সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার হয়ে যায়।

মনে রাখবেন:

  • ১৪৯৮ সালে ভাস্কো-দা-গামা কালিকট বন্দরে পৌঁছান
  • ১৬৯০ সালে জব চার্নক কলকাতা প্রতিষ্ঠা করেন
  • বাংলার সিল্ক ও মসলা ইউরোপীয় বণিকদের প্রধান আকর্ষণ ছিল

পাঠ ৩: বাংলায় উপনিবেশিক শক্তির বিজয়

সিরাজউদ্দৌলা: শেষ স্বাধীন নবাব

নবাব আলিবর্দি খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় নাতি সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২২ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন (১৭৫৬)। তাঁর সামনে ছিল একাধিক চ্যালেঞ্জ:

পলাশির যুদ্ধ (২৩ জুন, ১৭৫৭)

ঘটনা: দেশীয় ষড়যন্ত্রকারী ও ইংরেজরা গোপনে জোট বাঁধে। পলাশির আম্রকাননে সংঘটিত যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব পরাজিত ও নিহত হন। জয়ের পর ইংরেজরা মীর জাফরকে নবাব বানালেও মূল ক্ষমতা তাদের হাতে চলে যায়। ধূর্ত ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ হন সর্বেসর্বা।

পরাজয়ের কারণ

১. শাসকদের দুর্বলতা

অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চক্রান্ত এবং তরুণ অনভিজ্ঞ নবাবের অপারগতা।

২. ইংরেজদের কূটকৌশল

দেশীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শক্তির অভাব, অন্যদিকে ইংরেজদের উত্তরোত্তর ক্ষমতা বৃদ্ধি।

৩. উন্নত সামরিক শক্তি

ইংরেজদের উন্নত সামরিক শক্তি, রণকৌশল ও নেতৃত্ব।

৪. সাধারণ মানুষের নিষ্ক্রিয়তা

অর্থনৈতিক শোষণের শিকার প্রজাদের সাথে শাসকদের দূরত্ব। নবাব-ইংরেজ দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষ ছিল নির্বিকার।

বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪)

মীর জাফরের উত্তরসূরী মীর কাসিম-এর পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার শাসন ক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের হস্তগত হয়।

পাঠ ৪-৫: উপনিবেশিক শাসন ও শোষণ

দ্বৈতশাসন (১৭৬৫)

বক্সারের যুদ্ধের পর মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ও কোম্পানির গভর্নর রবার্ট ক্লাইভের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। ক্লাইভ বাংলার নবাবের উপর শাসন ও বিচারবিভাগের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন কোম্পানির উপর। একেই দ্বৈতশাসন বলা হয়।

দ্বৈতশাসনের ফলাফল: এটি ছিল এদেশের মানুষের জন্য চরম অভিশাপ। রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পেয়ে ইংরেজরা প্রজাদের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে তা আদায়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০)

অতিরিক্ত করের চাপে জনগণের নাভিশ্বাস ওঠার সময় দেশে পরপর তিন বছর অনাবৃষ্টি হয়। ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬) বাংলায় নেমে আসে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। লাখ লাখ লোক অনাহারে মারা গেলেও কোম্পানি করের বোঝা কমানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এই দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোকের মৃত্যু হয়েছিল। ইতিহাসে এটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।

ইংরেজ শাসকদের কাজ

ভূমি রাজস্বব্যবস্থা

১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনে বাংলায় ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলের হাতে ভূমি রাজস্বব্যবস্থা অর্পণ করা হয়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩)

ব্রিটিশদের অনুগত জমিদার শ্রেণি তৈরি করা হয়।

প্রশাসনিক পরিবর্তন

মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় প্রশাসনিক দপ্তর, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতাকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ঘোষণা করেন।

শিক্ষা বিস্তার

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ও লর্ড হার্ডিঞ্জ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সূচনা করেন। সতীদাহ প্রথা ও বাল্যবিবাহ রোধ এবং বিধবা বিবাহ প্রবর্তনে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে সহযোগিতা দেওয়া হয়।

গভর্নর জেনারেল

১৭৭৩ সালের পর থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নরদের পদবি হয় গভর্নর জেনারেল। উল্লেখযোগ্য গভর্নর জেনারেল:

ওয়ারেন হেস্টিংস
লর্ড কর্নওয়ালিস
লর্ড ওয়েলেসলি
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক
লর্ড হার্ডিঞ্জ
লর্ড ডালহৌসি

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ও কোম্পানি শাসনের অবসান

১৮৫৭ সালে ইংরেজ অধ্যুষিত ভারতের বিভিন্ন ব্যারাকে সিপাহিদের মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ইংরেজরা উন্নত অস্ত্র ও চাতুর্যের মাধ্যমে এই বিদ্রোহ দমন করে। ১৮৫৮ সালের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারত শাসন আইন পাস হয়, যার মধ্য দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতের শাসনভার নিজ হাতে গ্রহণ করে।

ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব (১৮৫৮-১৯৪৭)

  • কৃষক ছিল সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, জমিদার ছিল সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি
  • বাংলার অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষি ও তাঁতশিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে
  • নারীসমাজ ব্যাপকভাবে পিছিয়ে ছিল
  • মধ্যবিত্ত সমাজ ততটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি
  • গোটা ভারত ছিল ব্রিটেনের উপনিবেশ - শোষণের ক্ষেত্র

পাঠ ৬-৭: উপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: বাংলার নবজাগরণ ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন

শিক্ষা বিস্তার ও নবজাগরণ

ইংরেজরা তাদের শাসন পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে দেশীয়দের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত একটি অনুগত শ্রেণি তৈরি করতে মনোযোগ দেয়। কিন্তু আধুনিক শিক্ষার সংস্পর্শে এসে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন চেতনার স্ফুরণ ঘটে।

১৭৮১
ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
১৭৯১
হিন্দুদের জন্য সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা।
১৮২১
শ্রীরামপুরে মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন। বইপুস্তক ছেপে জ্ঞানচর্চা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
১৮৫৭
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব

রাজা রামমোহন রায়

সমাজ সংস্কারক। সতীদাহ প্রথা রোধ ও আধুনিক শিক্ষার প্রসারে অবদান।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

বিধবা বিবাহ প্রবর্তন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ।

ডিরোজিও

অবাধ মুক্তমনে জ্ঞানচর্চার ধারা তৈরি করেন।

নওয়াব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আধুনিক জ্ঞানচর্চায় অবদান।

বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ।

মীর মশাররফ হোসেন, শরৎচন্দ্র, কাজী নজরুল ইসলাম

বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক অবদান।

ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন

বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)

ভাইসরয় লর্ড কার্জন ১৯০৩ সালে প্রস্তাব রাখেন যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাকে দুইভাগে ভাগ করা হবে। ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন প্রদেশ 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' গঠন। বস্তুত এর লক্ষ্য ছিল বাংলায় ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে বিভক্ত করা এবং হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাঙন ধরানো।

বঙ্গভঙ্গের ফলাফল: ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়। এটি ছিল ব্রিটিশদের 'ভাগ করো, শাসন করো' নীতির বহিঃপ্রকাশ।

বিভিন্ন আন্দোলন

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ

প্রথম দিকের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন।

সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭)

ব্রিটিশবিরোধী প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। নেতৃত্ব দেন মঙ্গল পান্ডে ও হাবিলদার রজব আলী। যোগ দেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, তাঁতিয়া টোপি ও বাহাদুর শাহ জাফর।

স্বদেশী আন্দোলন

বিলেতি পণ্য ও শিক্ষা বর্জন, দেশীয় পণ্য ও শিক্ষা প্রচলন।

বয়কট ও স্বরাজ আন্দোলন

ব্রিটিশ পণ্য বর্জন ও স্বশাসনের দাবি।

সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন

যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির মতো বিপ্লবী সংগঠন গড়ে ওঠে। বিপ্লবীদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (প্রথম নারী শহিদ)।

অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন

জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন নেতাজি সুভাষ বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শের-ই-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক।

পাঠ ৮: লাহোর প্রস্তাব ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা

লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০)

১৯৪০ সালে লাহোরে শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাগুলো নিয়ে রাষ্ট্রসমূহ গঠনের কথা বলা হয়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা (১৯৪৭)

লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়, যার ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুশ বছরের ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটে।

বাংলা বিভক্তি

ভারত বিভক্তির সাথে সাথে বাংলাও দুটি ভাগে বিভক্ত হয়:

পূর্ববাংলা

মুসলমান সংখ্যাগর্ষ্ঠ → পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয় (পরবর্তীতে বাংলাদেশ)।

পশ্চিমবঙ্গ

হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ → ভারতের সাথে যুক্ত হয়।

অখণ্ড বাংলা আন্দোলন: শরৎ বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চেষ্টা করেছিলেন অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার, কিন্তু তা সফল হয়নি। ব্রিটিশ অধীনতা থেকে মুক্তি পেলেও তা পূর্ববাংলার জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠতে পারেনি।

সারসংক্ষেপ

  • ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়
  • ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়
  • ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ লোক মারা যায়
  • ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয়
  • ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে কোম্পানি শাসনের অবসান হয় ও ব্রিটিশ সরকার সরাসরি শাসন শুরু করে
  • ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ব্রিটিশদের 'ভাগ করো, শাসন করো' নীতির অংশ ছিল
  • ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়
  • ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব ও ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মধ্য দিয়ে ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটে

অনুশীলনী ও প্রশ্ন

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

  • প্রশ্ন ১: বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন কে?
    ক. নবাব সিরাজউদ্দৌলা খ. ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ
    গ. নবাব আলীবর্দি খাঁ ঘ. ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি
  • প্রশ্ন ২: শশাঙ্কের মৃত্যুর পর একশত বছরকে মাৎস্যন্যায়ের যুগ বলা হয়। কারণ তখন-
    i. দেশে সর্বত্র বিশৃঙ্খলা বিরাজ করত
    ii. বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে খেয়ে ফেলত
    iii. শাসকবর্গ সুশাসনে অক্ষম ছিল
    নিচের কোনটি সঠিক?
    ক. i ও ii খ. i ও iii গ. ii ও iii ঘ. i, ii ও iii

সৃজনশীল প্রশ্ন

  • প্রশ্ন ১: ক. ভারতে প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন কে?
  • প্রশ্ন ১: খ. বাংলা ১১৭৬ সনে এ দেশে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় কেন?
  • প্রশ্ন ১: গ. উদ্দীপকে বর্ণিত পরিস্থিতির মতো উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় কীসের উদ্ভব ঘটেছিল? ব্যাখ্যা কর।
  • প্রশ্ন ১: ঘ. 'রায়হানার মতো শিক্ষিত নারীর জন্যই এদেশে নারী শিক্ষার পথ সুগম হয়' - উক্তিটির যথার্থতা নিরূপণ কর।

গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ধারণা

  • উপনিবেশ: অর্থনৈতিক শোষণ ও লাভের উদ্দেশ্যে এক দেশ অন্য দেশকে দখলে আনা
  • দ্বৈতশাসন: শাসন ও বিচার নবাবের হাতে, প্রতিরক্ষা কোম্পানির হাতে
  • ছিয়াত্তরের মন্বন্তর: ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ
  • চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত: ১৭৯৩ সালে চালু জমিদারি প্রথা
  • বারোভূঁইয়া: পূর্ব বাংলার জমিদার যারা মোগল আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন
  • মাৎস্যন্যায় যুগ: অরাজকতার যুগ (বড় মাছ যেমন ছোট মাছ খায়, তেমন অবস্থা)