একাদশ অধ্যায়: বাংলাদেশে জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবিলা

পাঠ ১–৮ | পৃষ্ঠা ১১৫-১২৯

সূচিপত্র

  1. পাঠ ১: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ধারণা
  2. পাঠ ২: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ ও প্রভাব
  3. পাঠ ৩: দুর্যোগের ধারণা ও ধরন
  4. পাঠ ৪ ও ৫: বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  5. পাঠ ৬: প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ
  6. পাঠ ৭: বাংলাদেশের জীবন ও অর্থনীতির উপর দুর্যোগের প্রভাব
  7. পাঠ ৮: দুর্যোগ মোকাবিলায় করণীয়

পাঠ ১: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ধারণা

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হলো পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রক্রিয়া। বিগত ১০০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৭৪° সেলসিয়াস বেড়েছে। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস) পোড়ানো, বন ধ্বংস ও বিভিন্ন শিল্প কারখানার কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এই গ্যাসগুলি সূর্য থেকে আগত তাপকে আটকে রেখে পৃথিবীকে উষ্ণ করে তুলছে, যা গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া নামে পরিচিত।

মূল ধারণা

পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাকৃতিকভাবেই গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে এই গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, যাকে আমরা বলছি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কীভাবে কাজ করে?

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান গ্যাস: কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), মিথেন (CH₄), নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O), ফ্লোরিনযুক্ত গ্যাস।
  • বায়ুমণ্ডলে CO₂-এর পরিমাণ শিল্প বিপ্লবের আগে ২৮০ ppm ছিল, বর্তমানে তা ৪২০ ppm-এর বেশি।
  • গত ১০০ বছরে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ০.৭৪° সে.।
  • IPCC প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা আরও ১.৫°–৪.৫° সে. বাড়তে পারে।
  • সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ: চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

জানতে চাই

  1. বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কাকে বলে?
  2. গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া কীভাবে কাজ করে?
  3. প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য কী?
  4. বায়ুমণ্ডলে CO₂ বৃদ্ধির কারণ কী?

পাঠ ২: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ ও প্রভাব

কারণসমূহ

প্রাকৃতিক কারণ

  • আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত
  • সূর্যের বিকিরণের পরিবর্তন
  • জলীয় বাষ্পের ভূমিকা
  • জলবায়ুর প্রাকৃতিক পরিবর্তনশীলতা

মানবসৃষ্ট কারণ (প্রধান)

  • জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো
  • বন উজাড় ও বনভূমি ধ্বংস
  • শিল্প কারখানা ও যানবাহনের নির্গমন
  • কৃষি খাত (ধান চাষ, গবাদি পশু)
  • প্লাস্টিক ও বর্জ্য পোড়ানো

মানবসৃষ্ট কারণ বিস্তারিত

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব

🌡
তাপমাত্রা বৃদ্ধি

গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও ব্যাপ্তি বেড়েছে। ২০১৫-২০১৯ ছিল রেকর্ড উষ্ণ বছর। ইউরোপে ২০২২ সালের তাপপ্রবাহে হাজারো মানুষ মারা যায়।

🧊
মেরু বরফ গলন

গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফ দ্রুত গলছে। উত্তর মেরুর বরফের পরিমাণ ৪০% কমে গেছে। হিমবাহ গলার কারণে নদী ও পানির উৎস হুমকির মুখে।

🌊
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

গত ১০০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ২০ সেমি বেড়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল হুমকির মুখে। মালদ্বীপ, তুভালুর মতো দ্বীপরাষ্ট্র ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে।

🌀
চরম আবহাওয়া

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, অতি বৃষ্টির তীব্রতা ও মাত্রা বেড়েছে। ক্যাটরিনা, সিডর, আইলা, আম্ফানের মতো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

🌾
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা

ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনিয়মিত বৃষ্টিতে কৃষি কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত তাপে ফসল নষ্ট হয়। খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

🦟
স্বাস্থ্য হুমকি

তাপজনিত রোগ, ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। বিশুদ্ধ পানি সংকট দেখা দেয়। অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে।

বাংলাদেশের জন্য বিশেষ হুমকি

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০-এ অবস্থান করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মাত্র ১ মিটার বাড়লেই বাংলাদেশের প্রায় ২০% এলাকা পানির নিচে চলে যাবে। এতে করে প্রায় ৩ কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। সুন্দরবনের মতো উপকূলীয় বনাঞ্চল লবণাক্ততা ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে হুমকির মুখে পড়বে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব: গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • IPCC-র মতে, ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ ২৬–৮২ সেমি বাড়তে পারে।
  • বাংলাদেশে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে খরার তীব্রতা বাড়ছে।
  • লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি ও সুপেয় পানি সংকট তীব্রতর হচ্ছে।
  • প্যারিস চুক্তি (২০১৫) অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২° সে.-এর নিচে এবং ১.৫° সে.-এ সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জানতে চাই

  1. বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান মানবসৃষ্ট কারণগুলো কী কী?
  2. বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কী প্রভাব পড়তে পারে?
  3. তাপপ্রবাহ ও খরা কীভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সাথে সম্পর্কিত?
  4. জলবায়ু উদ্বাস্তু কাদের বলা হয়?

পাঠ ৩: দুর্যোগের ধারণা ও ধরন

দুর্যোগ হলো এমন একটি আকস্মিক বা ধীরগতির ঘটনা যা একটি সমাজ বা অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং যার মোকাবিলায় স্থানীয় সম্পদ ও সক্ষমতা অপ্রতুল হয়। দুর্যোগের কারণে প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষতি এবং পরিবেশের ব্যাপক ধ্বংস ঘটে।

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট — এ দুই ভাগে দুর্যোগকে ভাগ করা যায়। তবে এ অধ্যায়ে আমরা প্রধানত প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়েই আলোচনা করব। বাংলাদেশ ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত কারণে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়।

🌪
প্রাকৃতিক দুর্যোগ

প্রকৃতির কারণে ঘটে। যেমন: ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, ভূমিকম্প, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, বজ্রপাত, ভূমিধস ইত্যাদি।

🏭
মানবসৃষ্ট দুর্যোগ

মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে ঘটে। যেমন: অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, ভবন ধস, রাসায়নিক দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, পারমাণবিক দুর্ঘটনা ইত্যাদি।

আকস্মিক দুর্যোগ

হঠাৎ ঘটে, পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। যেমন: ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, বজ্রপাত।

🐌
ধীরগতির দুর্যোগ

ধীরে ধীরে সংঘটিত হয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। যেমন: খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মরুকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন।

বাংলাদেশ কেন দুর্যোগপ্রবণ?

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, নিম্নভূমি, নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি ও ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু একে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এছাড়া জনসংখ্যার ঘনত্ব, দারিদ্র্য ও সীমিত সম্পদ দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৮০% এলাকা বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে।

জানতে চাই

  1. দুর্যোগ কাকে বলে?
  2. প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যে পার্থক্য কী?
  3. বাংলাদেশ কেন দুর্যোগপ্রবণ দেশ?
  4. আকস্মিক ও ধীরগতির দুর্যোগের উদাহরণ দাও।

পাঠ ৪ ও ৫: বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ

বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হয়। নিচে প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর বর্ণনা দেওয়া হলো:

ঘূর্ণিঝড় (Cyclone)

ঘূর্ণিঝড় হলো বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি তীব্র ঘূর্ণায়মান বায়ুপ্রবাহ যা উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ের সাথে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও জলোচ্ছ্বাস হয়। বাংলাদেশে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড় (প্রায় ৫ লক্ষ লোক মারা যায়), ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়, ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, ২০২০ সালের আম্ফান ও ২০২২ সালের আসানি। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা মাপা হয় সাফির-সিম্পসন স্কেলে।

বন্যা (Flood)

বাংলাদেশে প্রতি বছরই কম-বেশি বন্যা দেখা দেয়। অধিক বৃষ্টিপাত, নদীর পানি বৃদ্ধি, ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা হয়। বন্যার কারণে ফসল নষ্ট হয়, ঘরবাড়ি ডুবে যায়, মানুষ ও পশুপাখির প্রাণহানি ঘটে। বন্যা প্রধানত চার ধরনের: নদীর বন্যা, বর্ষা মৌসুমি বন্যা, পাহাড়ি ঢল (হিমালয়ের পাদদেশে), ও জলোচ্ছ্বাসজনিত বন্যা। ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ ও ২০০৭ সালের বন্যা ছিল ভয়াবহ।

খরা (Drought)

দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত না হলে ও পানির অভাব দেখা দিলে খরা হয়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল (রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, রংপুর) খরাপ্রবণ। খরা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে, খাদ্য সংকট তৈরি করে, এবং সুপেয় পানির অভাব দেখা দেয়। বাংলাদেশে ১৯৭২, ১৯৭৯ ও ১৯৯৪ সালের খরা ভয়াবহ ছিল।

ভূমিকম্প (Earthquake)

ভূ-অভ্যন্তরে প্লেটের নড়াচড়ার কারণে ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় এটি মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও পূর্বাঞ্চল (সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা) ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯১৮ সালে সিলেট ও ১৯৩০ সালে ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা মাপা হয়।

নদীভাঙন (River Erosion)

বাংলাদেশে নদীভাঙন একটি ব্যাপক সমস্যা। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রসহ প্রধান নদীগুলোর তীরবর্তী এলাকায় প্রতিবছর নদীভাঙনে হাজার হাজার একর জমি বিলীন হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়। নদীভাঙনের কারণে মানুষকে বারবার স্থানান্তরিত হতে হয়।

জলোচ্ছ্বাস (Storm Surge)

ঘূর্ণিঝড়ের সময় বঙ্গোপসাগর থেকে পানি উপকূলের দিকে ধেয়ে আসে, যাকে জলোচ্ছ্বাস বলে। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা কখনও কখনও ৬–১০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

বজ্রপাত (Thunderstorm/Lightning)

প্রি-মনসুন ও মনসুন মৌসুমে বাংলাদেশে প্রচুর বজ্রপাত হয়। প্রতিবছর গড়ে ৩০০ জনের বেশি মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়। ২০১৬ সালে একদিনে ৮২ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। বজ্রপাতের তীব্রতা কাটাতে তালগাছ রোপণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • ঘূর্ণিঝড়: ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায় — এটি ইতিহাসের প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়।
  • বন্যা: ১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী (দুই মাসের বেশি)।
  • খরা: উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল সবচেয়ে বেশি খরাপ্রবণ।
  • ভূমিকম্প: বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল: সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ।
  • নদীভাঙন: প্রতিবছর প্রায় ১০,০০০ হেক্টর জমি নদীভাঙনে বিলীন হয়।
  • বজ্রপাত: বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যায়।

জানতে চাই

  1. বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় কেন বেশি হয়?
  2. বন্যা কত প্রকার ও কী কী?
  3. খরাপ্রবণ এলাকা কোনগুলো?
  4. নদীভাঙনের কারণে কী কী সমস্যা দেখা দেয়?
  5. বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায় কী?

পাঠ ৬: প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পেছনে ভৌগোলিক, জলবায়ুগত, ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণ বিদ্যমান। নিচে এগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রাকৃতিক কারণ

মানবসৃষ্ট কারণ

মানুষই কি প্রকৃতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে?

হ্যাঁ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বৃদ্ধির পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ড বড় ভূমিকা রাখছে। বন উজাড়, নদী দখল, জলাশয় ভরাট, ও অতিরিক্ত কার্বন নির্গমন দুর্যোগের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও অনিয়মিত ও শক্তিশালী হচ্ছে।

সংক্ষিপ্তসার: দুর্যোগের কারণ

  • বাংলাদেশের নিম্নভূমি ও ব-দ্বীপ অবস্থান বন্যার প্রধান প্রাকৃতিক কারণ।
  • বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম দেয়।
  • বন উজাড়, নদী দখল, জলবায়ু পরিবর্তন মানবসৃষ্ট কারণ।
  • প্লেট সীমান্তে অবস্থান ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ায়।

জানতে চাই

  1. প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাকৃতিক কারণগুলো কী কী?
  2. নদী দখল ও ভরাট কীভাবে বন্যা বৃদ্ধি করে?
  3. জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ায়?
  4. অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে কোন ধরনের দুর্যোগ বেশি হয়?

পাঠ ৭: বাংলাদেশের জীবন ও অর্থনীতির উপর দুর্যোগের প্রভাব

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জনজীবন ও অর্থনীতির উপর গভীর ও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। নিচে বিভিন্ন দিক থেকে এই প্রভাব আলোচনা করা হলো:

জীবনের উপর প্রভাব

অর্থনীতির উপর প্রভাব

🌾
কৃষি খাত

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান খাত কৃষি। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রতিবছর দুর্যোগে প্রায় ১–২ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য নষ্ট হয়।

🏢
অবকাঠামো

রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, বিদ্যুৎ লাইন, টেলিফোন নেটওয়ার্ক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুনরুদ্ধারে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।

💰
অর্থনৈতিক ক্ষতি

প্রতিবছর দুর্যোগে বাংলাদেশের অর্থনীতির গড় ক্ষতি হয় প্রায় ৩–৫ বিলিয়ন ডলার। জিডিপির ১–২% দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়।

🏖
অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি

দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস উপকূল ও নদীতীরের মানুষকে উদ্বাস্তু করে তুলছে।

জলবায়ু উদ্বাস্তু: এক ক্রমবর্ধমান সমস্যা

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এরা গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে, যার ফলে শহরগুলোর উপর চাপ বাড়ছে এবং নগর দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তু হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ১.৫% ক্ষতি হয়।
  • বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের একটি।
  • নদীভাঙনে প্রতি বছর প্রায় ৫০,০০০–১,০০,০০০ মানুষ গৃহহীন হয়।
  • দুর্যোগের পরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

জানতে চাই

  1. দুর্যোগ কীভাবে বাংলাদেশের কৃষি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে?
  2. জলবায়ু উদ্বাস্তু কাদের বলা হয়?
  3. দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির কেমন ক্ষতি হয়?
  4. দুর্যোগের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব কী?

পাঠ ৮: দুর্যোগ মোকাবিলায় করণীয়

দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি, সঠিক সময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ ও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগ মোকাবিলাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়: দুর্যোগ পূর্ব প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন করণীয়, ও দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন।

দুর্যোগ পূর্ব প্রস্তুতি

দুর্যোগকালীন করণীয়

দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম

বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর (DDM) ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় (MoDMR) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (CPP) বিশ্বের অন্যতম সফল প্রারম্ভিক সতর্কীকরণ কর্মসূচি। এর ফলে প্রাণহানি ব্যাপকভাবে কমেছে — ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লক্ষ মানুষ মারা গেলেও ২০০৭ সালের সিডরে মৃত্যু হয় প্রায় ৩,৫০০ জনে, এবং ২০২০ সালের আম্ফানে মৃত্যু হয় প্রায় ৩০ জনে। এটি প্রস্তুতি ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে করণীয়

  • পরিবারের সকলের সাথে দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনা তৈরি করা।
  • জরুরি যোগাযোগের তালিকা (ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল) হাতে রাখা।
  • বাসায় জরুরি সরঞ্জামের বাক্স (ডিজাস্টার কিট) তৈরি রাখা।
  • দুর্যোগ সংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকা ও অন্যদের সচেতন করা।
  • গাছ রোপণ করা ও জলাশয় সংরক্ষণে ভূমিকা রাখা।
  • প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার না করা।

দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

  • হেল্পলাইন: জাতীয় জরুরি সেবা: ৯৯৯, দুর্যোগ তথ্য: ১০৯০, ফায়ার সার্ভিস: ১৬১৬৩।
  • সাইক্লোন শেল্টার: উপকূলীয় এলাকায় ৪,০০০+ সাইক্লোন শেল্টার ও ২০০+ মাল্টি-পারপাস শেল্টার।
  • স্বেচ্ছাসেবক: CPP-তে ৭৬,০০০+ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছে।
  • বন ব্যবস্থাপনা: উপকূলীয় বনায়ন কর্মসূচির অধীনে ১,৫০,০০০ হেক্টর জমিতে বনায়ন।
  • আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: প্যারিস চুক্তি, সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক, IPCC-তে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ।

জানতে চাই

  1. প্রারম্ভিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কী ও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
  2. ঘূর্ণিঝড়কালীন কী কী করণীয়?
  3. বাংলাদেশের সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (CPP) সম্পর্কে কী জান?
  4. ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় কী কী করা যেতে পারে?
  5. দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসনের পদক্ষেপগুলো বর্ণনা কর।
  6. উপকূলীয় বনায়ন কেন গুরুত্বপূর্ণ?