চতুর্থ অধ্যায়: বাংলাদেশের অর্থনীতি

পাঠ ১–৬ | পৃষ্ঠা ৪৫–৫২

📋 সূচিপত্র

পাঠ ১ বাংলাদেশের অর্থনীতি

অর্থনীতি কী?

মানুষের সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে অসীম চাহিদা পূরণের প্রচেষ্টাকেই অর্থনীতি বলে। অন্যভাবে বলা যায়, অর্থনীতি হলো উৎপাদন, বণ্টন, ভোগ ও বিনিময়ের সঙ্গে জড়িত মানুষের সকল কার্যক্রমের সমষ্টি। প্রতিটি দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান, কর্মসংস্থান, শিল্প-বাণিজ্য ও সামগ্রিক উন্নয়ন অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল।

🔑 সংজ্ঞা: অর্থনীতি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের অসীম চাহিদা পূরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করে।

অর্থনীতির প্রকারভেদ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনীতি প্রধানত চার প্রকারে বিভক্ত:

বাংলাদেশের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশের অর্থনীতি মিশ্র অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

অর্থনীতির মূল উপাদান

যে কোনো দেশের অর্থনীতি তিনটি প্রধান খাত বা সেক্টরে বিভক্ত:

🌾 কৃষি খাত

ধান, পাট, চা, গম, আলু, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি উৎপাদন। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০% এ খাতে নিয়োজিত।

🏭 শিল্প খাত

পোশাক শিল্প, পাটশিল্প, চামড়াশিল্প, ওষুধ শিল্প, সিমেন্ট, ইস্পাত, সিরামিক ইত্যাদি। জিডিপিতে অবদান প্রায় ৩৬%।

🏢 সেবা খাত

ব্যাংক, বীমা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন, খুচরা বাণিজ্য। জিডিপিতে সর্বোচ্চ অবদান প্রায় ৫৩%।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরকার পর্যায়ক্রমিক পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। বর্তমানে ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০২০–২০২৫) বাস্তবায়িত হচ্ছে। পরিকল্পনাগুলোর লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন।

💡 জেনে রাখো: বাংলাদেশ ২০২১ সালে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। ২০২৬ সালের মধ্যে এই উত্তরণ কার্যকর হবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পাঠ ২ বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদনে বিভিন্ন খাতের অবদান

জিডিপি (GDP) কী?

জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন (Gross Domestic Product) হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছরে) দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত সকল পণ্য ও সেবার মোট বাজারমূল্য। জিডিপি একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাপক। বাংলাদেশের জিডিপি বর্তমানে প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০২৪–২৫ অর্থবছর)।

খাতওয়ারি জিডিপিতে অবদান

নিচে বাংলাদেশের জিডিপিতে বিভিন্ন খাতের আনুমানিক অবদান দেখানো হলো:

কৃষি ১১%
শিল্প ৩৬%
সেবা ৫৩%

🌾 কৃষি খাত (প্রায় ১১%)

~১১%

উপখাত: কৃষি ও বনায়ন ৯.৫%, মৎস্য ২.৫%, প্রাণিসম্পদ ১.৮%

প্রধান ফসল: ধান, পাট, গম, আলু, চা, আখ, সবজি, ফলমূল

অন্যান্য: মৎস্য খাতে বিশ্বে তৃতীয়, চা উৎপাদনে নবম, ধান উৎপাদনে চতুর্থ

🏭 শিল্প খাত (প্রায় ৩৬%)

~৩৬%

প্রধান শিল্প: তৈরি পোশাক (RMG), পাট, চামড়া, ওষুধ, সিমেন্ট, ইস্পাত, সিরামিক

RMG খাত: মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪% আসে পোশাক খাত থেকে

ওষুধ শিল্প: দেশের চাহিদার ৯৮% পূরণ করে, বিশ্বের ৭২টি দেশে রপ্তানি

🏢 সেবা খাত (প্রায় ৫৩%)

~৫৩%

উপখাত: পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, পরিবহন, ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট

আইটি খাত: ফ্রিল্যান্সিং ও সফটওয়্যার রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে

অর্থনৈতিক অঞ্চল: ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা

কৃষি খাতের গুরুত্ব

জিডিপিতে কৃষির প্রত্যক্ষ অবদান ১১% হলেও পরোক্ষভাবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০% কৃষি ও কৃষিনির্ভর কাজে সম্পৃক্ত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

শিল্প খাতের অগ্রগতি

বাংলাদেশের শিল্পায়ন মূলত তৈরি পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৪,৫০০টির বেশি তৈরি পোশাক কারখানা আছে। এছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, হিমায়িত চিংড়ি, ওষুধ ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য উল্লেখযোগ্য হারে রপ্তানি হচ্ছে।

📊 তথ্য: বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ (চীনের পরেই)। বিগত ১০ বছরে শিল্প খাতের জিডিপি অবদান ২৫% থেকে বেড়ে ৩৬% হয়েছে।

সেবা খাতের সম্প্রসারণ

সেবা খাত বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাত। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ, মোবাইল ব্যাংকিং (নগদ, বিকাশ, রকেট) ও ডিজিটাল লেনদেন সেবা খাতকে আরও শক্তিশালী করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম ফ্রিল্যান্সিং হাব। প্রায় ৬ লক্ষের বেশি তরুণ-তরুণী ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।

পাঠ ৩ বাংলাদেশে মানব উন্নয়ন

মানব উন্নয়নের ধারণা

মানব উন্নয়ন হলো মানুষের সম্ভাবনার বিকাশ, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করার প্রক্রিয়া। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই মানব উন্নয়নের মূল লক্ষ্য।

🎯 মূল ভাবনা: অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানেই মানব উন্নয়ন নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই ঘটে যখন মানুষের জীবনযাত্রার মান প্রকৃত অর্থে উন্নত হয়— তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আয়ের পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা তৈরি হয়।

মানব উন্নয়নের মৌলিক উপাদান

বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন অগ্রগতি

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ মানব উন্নয়নে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৭১ সালে মাত্র ২৫% ছিল শিক্ষার হার, যা বর্তমানে প্রায় ৭৬%-এ উন্নীত হয়েছে। গড় আয়ু বেড়েছে ৪৭ বছর থেকে প্রায় ৭৩ বছর-এ। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মাতৃমৃত্যুর হারও হ্রাস পেয়েছে।

১৯৭১ — স্বাধীনতার সময় শিক্ষার হার ২৫%, গড় আয়ু ৪৭ বছর, অত্যন্ত উচ্চ দারিদ্র্যের হার
১৯৯০ — শিক্ষার হার ৩৫%, প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার শুরু, টিকা দানের হার বাড়ে
২০০০ — শিক্ষার হার ৫০%, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস
২০১৫ — শিক্ষার হার ৭০%, এমডিজি অর্জনে সাফল্য, গড় আয়ু ৭১ বছর
২০২৪ — শিক্ষার হার ~৭৬%, গড় আয়ু ~৭৩ বছর, দারিদ্র্যের হার ১৮% এর নিচে, এলডিসি থেকে উত্তরণ

মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের সাফল্যের কারণ

✅ বাংলাদেশের মানব উন্নয়নের সাফল্য:
  • শিক্ষার হার ২৫% থেকে ৭৬%-এ উন্নীত (৩ গুণের বেশি)
  • গড় আয়ু ৪৭ বছর থেকে বেড়ে ৭৩ বছর (২৬ বছর বৃদ্ধি)
  • দারিদ্র্যের হার ৮০% থেকে ১৮% এর নিচে নেমেছে
  • মাতৃমৃত্যুর হার (প্রতি ১ লক্ষে) ৮০০ থেকে কমে ~১৩৬-এ নেমেছে
  • ৫ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার (প্রতি হাজারে) ২৫০ থেকে ~৩১-এ নেমেছে

পাঠ ৪ মানব উন্নয়ন সূচক (HDI)

মানব উন্নয়ন সূচক কী?

মানব উন্নয়ন সূচক বা HDI (Human Development Index) হলো জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) কর্তৃক প্রকাশিত একটি যৌগিক সূচক যা একটি দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অবস্থা পরিমাপ করে। ১৯৯০ সাল থেকে প্রতি বছর UNDP তাদের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে (Human Development Report) দেশগুলোর HDI প্রকাশ করে।

HDI-এর তিনটি প্রধান সূচক

🩺 স্বাস্থ্য

সূচক: জন্মের সময় গড় আয়ু (Life Expectancy at Birth)

বাংলাদেশ: প্রায় ৭৩ বছর

ব্যাখ্যা: একটি দেশের মানুষের গড় কত বছর বাঁচার সম্ভাবনা তা নির্দেশ করে। উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, পুষ্টি ও চিকিৎসা সেবার প্রাপ্যতা এখানে প্রতিফলিত হয়।

📚 শিক্ষা

সূচক: প্রাপ্তবয়স্কদের গড় শিক্ষাবর্ষ (Mean Years of Schooling) ও প্রত্যাশিত শিক্ষাবর্ষ (Expected Years of Schooling)

বাংলাদেশ: গড় শিক্ষাবর্ষ ~৬.২ বছর, প্রত্যাশিত শিক্ষাবর্ষ ~১২.৪ বছর

💰 জীবনযাত্রার মান

সূচক: মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (GNI per capita)

বাংলাদেশ: প্রায় ২,৭৮৮ মার্কিন ডলার (PPP)

ব্যাখ্যা: ক্রয়ক্ষমতার সমতা (PPP) অনুযায়ী মাথাপিছু আয় দিয়ে জীবনযাত্রার মান পরিমাপ করা হয়।

HDI-এর মান এবং শ্রেণিবিন্যাস

HDI-এর মান ০ থেকে ১-এর মধ্যে হয়। মান যত বেশি, মানব উন্নয়ন তত বেশি। চারটি শ্রেণি:

📊 বাংলাদেশের HDI: ২০২২ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের HDI মান ০.৬৬১ যা মধ্যম মানব উন্নয়ন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের ১৯১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৯তম

HDI-এর গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা

গুরুত্ব:

সীমাবদ্ধতা:

পাঠ ৫ বাংলাদেশ ও উন্নয়নশীল কয়েকটি দেশের তুলনা

তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়নকে ভালোভাবে বোঝার জন্য অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে তুলনা করা জরুরি। নিচে কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সূচকের তুলনা দেওয়া হলো:

সূচক 🇧🇩 বাংলাদেশ 🇮🇳 ভারত 🇵🇰 পাকিস্তান 🇱🇰 শ্রীলঙ্কা 🇳🇵 নেপাল
জনসংখ্যা (কোটি) ~১৭.৩ ~১৪২ ~২৪ ~২.২ ~৩.১
জিডিপি (বিলিয়ন $) ~৪৬০ ~৩,৭৩০ ~৩৪০ ~৭৫ ~৪২
মাথাপিছু আয় ($) ~২,৭৮৮ ~২,৩৮০ ~১,৪৫০ ~৩,৭৫০ ~১,৩৪০
জীবন expectancy (বছর) ~৭৩ ~৬৭ ~৬৬ ~৭৭ ~৬৮
শিক্ষার হার (%) ~৭৬ ~৭৬ ~৫৮ ~৯২ ~৭০
HDI মান ০.৬৬১ ০.৬৩৩ ০.৫৪৪ ০.৭৮২ ০.৬০২
HDI র্যাঙ্ক ১২৯ ১৩৪ ১৬৪ ৭৮ ১৪৬
🔍 পর্যবেক্ষণ: বাংলাদেশ তার স্বল্প আয় এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানব উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলিতে ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে। বিশেষ করে শিক্ষার হার, গড় আয়ু ও HDI-তে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কার পরেই দ্বিতীয় সেরা অবস্থানে।

তুলনা থেকে শিক্ষা

📌 মূল কথা: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানব উন্নয়নে দক্ষিণ এশিয়ার একটি মডেল দেশে পরিণত হয়েছে। সীমিত সম্পদ নিয়েও সঠিক পরিকল্পনা, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ এবং এনজিও-র কার্যকর ভূমিকা বাংলাদেশের সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি।

পাঠ ৬ প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স

প্রবাসী আয় (রেমিটেন্স) কী?

প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স হলো বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা তাদের উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠানো। এই অর্থ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস।

💵 সংজ্ঞা: রেমিটেন্স হলো প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের পরিবার ও স্বজনদের কাছে পাঠানো অর্থ, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করে এবং অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনে।

বাংলাদেশে রেমিটেন্সের গুরুত্ব

🌍 বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন

পোশাক শিল্পের পরেই রেমিটেন্স বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাত। বার্ষিক প্রায় ২৪–২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স আসে।

🏠 দারিদ্র্য হ্রাস

প্রবাসী আয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। লাখ লাখ পরিবার রেমিটেন্সের ওপর নির্ভরশীল। এটি দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

📈 বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

রেমিটেন্স বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে, যা আমদানি ব্যয় মেটাতে ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে সহায়ক।

🏦 ব্যাংকিং খাতে প্রভাব

প্রবাসী আয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য বাড়ায় এবং দেশের আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করে। স্থানীয় বিনিয়োগ ও ভোগ বাড়াতে সাহায্য করে।

প্রবাসী কর্মীদের গন্তব্য দেশ

বাংলাদেশি প্রবাসীরা প্রধানত নিম্নলিখিত দেশগুলোতে কর্মরত:

রেমিটেন্স প্রবাহের চিত্র

২০০০ — ~১.৯ বিলিয়ন ডলার
২০১০ — ~১০.৯ বিলিয়ন ডলার
২০২০ — ~২১.৭ বিলিয়ন ডলার (মহামারীতেও বাড়ে)
২০২৪ — ~২৩.৮ বিলিয়ন ডলার (আনুমানিক)

রেমিটেন্সের সুষ্ঠু ব্যবহার

প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সম্পদ। কিন্তু এই অর্থ যদি শুধু ভোগেই ব্যয় হয়, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সীমিত থাকে। তাই রেমিটেন্সের সুষ্ঠু ব্যবহার প্রয়োজন:

✅ রেমিটেন্স সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
  • প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি অর্থ পাঠান
  • বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত
  • জিডিপির প্রায় ৬-৭% আসে রেমিটেন্স থেকে
  • গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি
  • বাংলাদেশ বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম রেমিটেন্স গ্রহীতা দেশ

📌 সারসংক্ষেপ ও মূল বিষয়সমূহ

📖 চতুর্থ অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

  • অর্থনীতি: সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদা পূরণের বিজ্ঞান। বাংলাদেশের অর্থনীতি মিশ্র অর্থনীতি
  • অর্থনীতির প্রকার: ঐতিহ্যবাহী, কমান্ড, বাজার ও মিশ্র অর্থনীতি।
  • অর্থনীতির ৩ খাত: কৃষি (~১১%), শিল্প (~৩৬%) ও সেবা (~৫৩%)।
  • জিডিপি: Gross Domestic Product — দেশের মোট উৎপাদনের বাজারমূল্য।
  • মানব উন্নয়ন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের সমন্বিত উন্নয়ন।
  • HDI: Human Development Index — ৩টি সূচক: গড় আয়ু, শিক্ষা, মাথাপিছু আয়।
  • বাংলাদেশের HDI: ০.৬৬১ (মধ্যম মানব উন্নয়ন), বিশ্বে ১২৯তম (১৯১টি দেশের মধ্যে)।
  • আন্তর্জাতিক তুলনা: শিক্ষা ও HDI-তে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে।
  • রেমিটেন্স: প্রবাসী আয় — বার্ষিক ~২৪ বিলিয়ন ডলার, জিডিপির ~৬-৭%।
  • বৈশ্বিক অবস্থান: পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয়, রেমিটেন্স প্রাপ্তিতে ৮ম, ধান উৎপাদনে ৪র্থ।

📅 পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন: অর্থনীতির সংজ্ঞা, জিডিপি, HDI-এর উপাদান, রেমিটেন্সের গুরুত্ব ইত্যাদি।

📊 চার্ট ও তথ্য মনে রাখো

খাতওয়ারি জিডিপির হার, HDI-এর মান, আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং ও তুলনামূলক সারণি।

📝 সৃজনশীল প্রশ্নের প্রস্তুতি

উদ্দীপক বিশ্লেষণে খাতওয়ারি অবদান ও মানব উন্নয়নের সূচক তুলে ধরা।

✍️ অনুশীলনী ও প্রশ্নমালা

ক. জ্ঞানমূলক প্রশ্ন (MCQ)

নিচের প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর নির্বাচন করো:

  1. বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন ধরনের?

    ক) ঐতিহ্যবাহী অর্থনীতি খ) কমান্ড অর্থনীতি গ) মিশ্র অর্থনীতি ঘ) বাজার অর্থনীতি
  2. জিডিপির পূর্ণরূপ কী?

    ক) Gross Domestic Product খ) Gross Development Product গ) General Domestic Product ঘ) Gross Domestic Profit
  3. জিডিপিতে বাংলাদেশের সেবা খাতের অবদান কত?

    ক) প্রায় ১১% খ) প্রায় ৩৬% গ) প্রায় ৫৩% ঘ) প্রায় ২৫%
  4. HDI-এর পূর্ণরূপ কী?

    ক) Human Development Index খ) Human Development Indicator গ) Health and Development Index ঘ) Human Digital Index
  5. বাংলাদেশের HDI মান কত?

    ক) ০.৫৪৪ খ) ০.৬৬১ গ) ০.৭৮২ ঘ) ০.৬৩৩
  6. বাংলাদেশ বিশ্বের কততম বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক?

    ক) প্রথম খ) দ্বিতীয় গ) তৃতীয় ঘ) চতুর্থ
  7. মানব উন্নয়নের সূচক কে প্রকাশ করে?

    ক) বিশ্ব ব্যাংক খ) জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) গ) আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ঘ) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
  8. বাংলাদেশের বার্ষিক রেমিটেন্স কত?

    ক) ~১২ বিলিয়ন ডলার খ) ~২৪ বিলিয়ন ডলার গ) ~৩৬ বিলিয়ন ডলার ঘ) ~৪৮ বিলিয়ন ডলার

খ. সৃজনশীল প্রশ্ন

নিচের উদ্দীপক পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:

উদ্দীপক: সুমন সাহেব একজন অর্থনীতি বিশ্লেষক। তিনি এক সেমিনারে বললেন, "বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় কৃষি প্রধান অর্থনীতি ছিল, এখন শিল্প ও সেবা খাত সামনে চলে এসেছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্প ও রেমিটেন্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান দুই উৎস। তবে মানব উন্নয়নের দিক থেকে আমাদের আরও অনেক দূর এগোনোর বাকি আছে। HDI-তে আমাদের অবস্থান উন্নত করতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।"

  1. অর্থনীতি কাকে বলে? সংজ্ঞা দাও।
  2. মিশ্র অর্থনীতি বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা করো।
  3. উদ্দীপক অনুসারে বাংলাদেশের অর্থনীতির খাতওয়ারি জিডিপি অবদানের একটি বর্ণনা দাও।
  4. বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্সের গুরুত্ব উদ্দীপকের আলোকে ব্যাখ্যা করো।
  5. মানব উন্নয়ন সূচক (HDI) বলতে কী বোঝায়? বাংলাদেশের HDI-এর অবস্থান উন্নত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে তা বিশ্লেষণ করো।

গ. সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন

  1. অর্থনীতির ৪টি প্রকারভেদ উল্লেখ করো।
  2. জিডিপি ও জিএনপি-র মধ্যে পার্থক্য কী?
  3. মানব উন্নয়নের ৩টি মৌলিক উপাদান কী কী?
  4. বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।
  5. প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স দেশের অর্থনীতিতে কীভাবে ভূমিকা রাখে?
  6. বাংলাদেশের মানব উন্নয়নের সাফল্যের ৪টি কারণ লেখো।
  7. পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কী? বর্তমানে কোন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
  8. বাংলাদেশের HDI মান ও র্যাঙ্ক উল্লেখ করো।

ঘ. বর্ণনামূলক প্রশ্ন

  1. "বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি মিশ্র অর্থনীতি।" — বিশ্লেষণ করো।
  2. বাংলাদেশের জিডিপিতে বিভিন্ন খাতের অবদান বর্ণনা করে একটি তুলনামূলক চিত্র দাও।
  3. মানব উন্নয়ন সূচক (HDI)-এর উপাদানগুলো ব্যাখ্যা করো। বাংলাদেশের HDI উন্নয়নে করণীয় কী? আলোচনা করো।
  4. বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মানব উন্নয়ন সূচকের তুলনা দাও।
  5. প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে — ব্যাখ্যা করো।