সরকার হলো রাষ্ট্রের সেই প্রতিষ্ঠান যা জনগণের পক্ষে আইন প্রণয়ন, আইন কার্যকর ও বিচারকার্য পরিচালনা করে। সরকার রাষ্ট্রের অভিপ্রায় ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রধান হাতিয়ার। রাষ্ট্রের স্থায়ী উপাদান হলেও সরকার অস্থায়ী — নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার পরিচালনার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। সরকার প্রধানত দুইভাবে শ্রেণিবিভাগ করা যায়:
এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় বা জাতীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে। প্রাদেশিক বা স্থানীয় সরকারগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা লাভ করে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ থাকে।
উদাহরণ: বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান
বৈশিষ্ট্য: একক সংবিধান, একক নাগরিকত্ব, কেন্দ্রীয় সরকারের আধিপত্য, শক্তিশালী কেন্দ্র
যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক/রাজ্য সরকারের মধ্যে সাংবিধানিকভাবে বণ্টিত থাকে। প্রত্যেক স্তরের সরকার নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম।
উদাহরণ: ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া
বৈশিষ্ট্য: লিখিত সংবিধান, দ্বৈত শাসনব্যবস্থা, দ্বৈত নাগরিকত্ব, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা
| বৈশিষ্ট্য | এককেন্দ্রিক সরকার | যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার |
|---|---|---|
| ক্ষমতা বণ্টন | সকল ক্ষমতা কেন্দ্রে ন্যস্ত | কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যে বিভক্ত |
| সংবিধান | একক সংবিধান | লিখিত ও সর্বোচ্চ সংবিধান |
| নাগরিকত্ব | একক নাগরিকত্ব | দ্বৈত নাগরিকত্ব (কেন্দ্রীয় ও রাজ্য) |
| নমনীয়তা | অপেক্ষাকৃত নমনীয় | দৃঢ় ও অনমনীয় |
| যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য | কেন্দ্রের আধিপত্য বিদ্যমান | স্বায়ত্তশাসিত অঙ্গরাজ্য |
এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান (রাষ্ট্রপতি) থাকলেও সরকারপ্রধান হন প্রধানমন্ত্রী। শাসনকার্যের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার ওপর ন্যস্ত থাকে। মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়ী থাকে।
উদাহরণ: বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, ভারত, কানাডা
বৈশিষ্ট্য: আইনসভা ও শাসন বিভাগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, যৌথ দায়িত্ব, বিরোধী দল
এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি একই সাথে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান। রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত এবং রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধ থাকে, সংসদের কাছে নয়।
উদাহরণ: যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া
বৈশিষ্ট্য: ক্ষমতা পৃথকীকরণ, রাষ্ট্রপতি নির্বাহী, আইনসভা থেকে পৃথক
বাংলাদেশের সরকার পদ্ধতি হলো সংসদীয় গণতন্ত্র বা Westminster ব্যবস্থা। এটি যুক্তরাজ্যের সংসদীয় পদ্ধতি থেকে অনুপ্রাণিত। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের আইনসভা বা সংসদের নাম জাতীয় সংসদ (Jatiya Sangsad) যা এককক্ষবিশিষ্ট (Unicameral)।
রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাকে নিয়োগ দেন। মন্ত্রিসভা জাতীয় সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়ী।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট (Unicameral) আইনসভা। মোট আসন সংখ্যা ৩৫০টি। এর মধ্যে ৩০০টি আসন সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং ৫০টি আসন নারী সংসদ সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত। সংসদের মেয়াদ ৫ বছর। স্পিকার সংসদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূল আদর্শ ও দর্শন যা সংবিধানে সন্নিবেশিত থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ৮–২৫) রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। এই মূলনীতিগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে এবং আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণে সরকারকে দিকনির্দেশনা দেয়।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই জাতীয়তাবাদ বাস্তবে রূপ লাভ করে। বাংলাদেশের নাগরিকগণ 'বাংলাদেশি' হিসেবে পরিচিত — জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করেন।
গুরুত্ব: দেশপ্রেম, ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টি করে; বৈদেশিক আগ্রাসন প্রতিরোধে সহায়তা করে; সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার: বাংলাদেশের সমাজতন্ত্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০ বলে — "একটি সুশৃঙ্খল ও ন্যায়ানুগ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করিতে সমাজতন্ত্রের স্বপক্ষে যুক্তিগুলোই একমাত্র পথ।" বাংলাদেশের সমাজতন্ত্র হলো গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র — যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্য হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গুরুত্ব: দারিদ্র্য বিমোচন, আয়ের সুষম বণ্টন, ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
জনগণের অংশগ্রহণ: গণতন্ত্র বলতে বোঝায় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ বলে — "প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।" বাংলাদেশের গণতন্ত্র সংসদীয় গণতন্ত্র — যেখানে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে। নিয়মিত নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত।
গুরুত্ব: জনগণের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করে, মানবাধিকার সুরক্ষা করে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
সকল ধর্মের সমান অধিকার: ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে বোঝায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা না দেওয়া। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২ ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়, বরং সকল ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের সমান দূরত্ব ও সমান সুযোগ প্রদান। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলেও সংবিধান অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে।
গুরুত্ব: ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, ধর্মীয় বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা দূর করে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখে।
রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলো আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য নয় — অর্থাৎ এগুলোর ভিত্তিতে আদালতে মামলা করা যায় না। তবে এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনা ও আইন প্রণয়নের মূল দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। সরকারের নীতি-নির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাজেট বরাদ্দে এই মূলনীতিগুলো অনুসরণ করা হয়।
সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন, যেখানে সরকারের গঠন, ক্ষমতা, কার্যাবলি এবং নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে বিধান থাকে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কাঠামো নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের সংবিধান ৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ সালে (বিজয় দিবস) কার্যকর হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান একটি লিখিত ও সুসংহত দলিল। সংবিধানের সকল বিধান সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে। এতে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, সরকারের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতা ও কার্যাবলি, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য স্পষ্টভাবে উল্লেখিত আছে।
সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের ইচ্ছার মাধ্যমেই সরকার গঠিত হয় এবং জনগণের পক্ষেই সরকার পরিচালিত হয়। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে।
বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র। এখানে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত। স্থানীয় সরকারগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা লাভ করে। বাংলাদেশে কোনো অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশ ব্যবস্থা নেই।
সংবিধান সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান। মন্ত্রিসভা জাতীয় সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ। সংসদ অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে।
সংবিধানে চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি — জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা — অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই মূলনীতিগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৬–৪৭) নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: আইনের দৃষ্টিতে সমতা (২৭), ধর্মীয় স্বাধীনতা (৪১), বাক্স্বাধীনতা (৩৯), চলাচলের স্বাধীনতা (৩৬) ইত্যাদি। এই অধিকারসমূহ আদালতে বলবৎযোগ্য।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা যায়। সংশোধনীর জন্য জাতীয় সংসদে মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের প্রয়োজন হয়। এ পর্যন্ত সংবিধান ১৭ বারের বেশি সংশোধন করা হয়েছে।
সংবিধান স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করেছে। সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে। আইনের ব্যাখ্যা দেওয়া ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করা বিচার বিভাগের কাজ।
রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের তিনটি পৃথক অঙ্গ রয়েছে। এই তিনটি অঙ্গ হলো — শাসন বিভাগ (Executive), আইন বিভাগ (Legislature) এবং বিচার বিভাগ (Judiciary)। প্রতিটি অঙ্গের নিজস্ব কাজ, ক্ষমতা ও দায়িত্ব রয়েছে। এই তিনটি অঙ্গের মধ্যে সমন্বয় ও ভারসাম্য (Checks and Balances) রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনটি অঙ্গ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং একটি অপরটির কাজ পর্যালোচনা করে — এটি ক্ষমতা পৃথকীকরণ নীতি (Separation of Powers) নামে পরিচিত।
নেতৃত্ব: প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা
গঠন: প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সরকারি কর্মচারীবৃন্দ
প্রধান কাজ:
নেতৃত্ব: জাতীয় সংসদ (স্পিকার)
গঠন: ৩৫০ জন সদস্য (৩০০ নির্বাচিত + ৫০ সংরক্ষিত নারী আসন)
প্রধান কাজ:
নেতৃত্ব: প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্ট
গঠন: সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ), অধস্তন আদালত
প্রধান কাজ:
রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের জন্য ক্ষমতা পৃথকীকরণ নীতি অনুসরণ করা হয়। এই নীতি অনুযায়ী, তিনটি অঙ্গের কাজ, ক্ষমতা ও দায়িত্ব পৃথক থাকে। তবে সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ সম্ভব নয়; বরং তিনটি অঙ্গের মধ্যে চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স (Checks and Balances) বিদ্যমান। যেমন:
স্থানীয় সরকার হলো কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সেই সরকারি প্রতিষ্ঠান যা নির্দিষ্ট স্থানীয় এলাকার (গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, শহর) শাসন ও উন্নয়নের দায়িত্ব পালন করে। স্থানীয় সরকার জনগণের নিকটবর্তী হওয়ায় স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানে এটি বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রধানত দুইভাগে বিভক্ত: গ্রামীণ স্থানীয় সরকার ও পৌর স্থানীয় সরকার। নিচে সমগ্র কাঠামো দেখানো হলো:
এটি স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। একটি ইউনিয়নে সাধারণত ৯টি ওয়ার্ড থাকে। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন করে মেম্বর এবং ইউনিয়ন থেকে একজন চেয়ারম্যান সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। নারীদের জন্য ৩টি সংরক্ষিত আসন থাকে।
কাজ: রেজিস্ট্রি ও সনদ প্রদান, স্থানীয় বিবাদ নিষ্পত্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বাস্তবায়ন, ছোটখাটো উন্নয়ন কাজ, ভূমি কর আদায়, শিক্ষা-স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা।
প্রতিটি উপজেলা পরিষদে একজন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) Secretariat হিসেবে কাজ করেন।
কাজ: উপজেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়ন, ই-গভর্নেন্স বাস্তবায়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন।
প্রতিটি জেলায় একটি জেলা পরিষদ থাকে। এর সদস্যরা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। জেলা পরিষদের প্রধান হলেন চেয়ারম্যান। জেলা প্রশাসক (DC) জেলা পরিষদের Secretary হিসেবে কাজ করেন।
কাজ: জেলা পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তত্ত্বাবধান, জেলা সড়ক ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ।
ছোট ও মাঝারি শহরাঞ্চলে পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। পৌরসভার প্রধান মেয়র এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলররা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। নারী কাউন্সিলরদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে। পৌরসভা 'ক', 'খ', 'গ' — এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত।
কাজ: নাগরিক সুবিধা (পানি, বিদ্যুৎ, রাস্তা), বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সনদ প্রদান (জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন), বাজার ব্যবস্থাপনা, সম্পত্তি কর নির্ধারণ ও আদায়।
বৃহৎ শহরাঞ্চলে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, গাজীপুর ইত্যাদি) সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত। সিটি কর্পোরেশনের প্রধান মেয়র এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলররা সরাসরি নির্বাচিত হন।
কাজ: নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর পরিবেশ সংরক্ষণ, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, বিল্ডিং অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ।
| স্তর | প্রধান | নির্বাচন পদ্ধতি | মেয়াদ |
|---|---|---|---|
| ইউনিয়ন পরিষদ | চেয়ারম্যান | সরাসরি ভোট | ৫ বছর |
| উপজেলা পরিষদ | চেয়ারম্যান | সরাসরি ভোট | ৫ বছর |
| জেলা পরিষদ | চেয়ারম্যান | পরোক্ষ ভোট | ৫ বছর |
| পৌরসভা | মেয়র | সরাসরি ভোট | ৫ বছর |
| সিটি কর্পোরেশন | মেয়র | সরাসরি ভোট | ৫ বছর |
গুরুত্ব: স্থানীয় সরকার জনগণের নিকটবর্তী হওয়ায় স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান সহজ হয়। এটি গণতন্ত্রের চর্চাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
চ্যালেঞ্জ: আর্থিক সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনবলের অভাব, কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি ইত্যাদি স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা সীমিত করে।
সুশাসন (Good Governance) হলো এমন একটি শাসন ব্যবস্থা যা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, অংশগ্রহণমূলক, আইনের শাসনসম্মত, কার্যকর ও ন্যায়ানুগ উপায়ে পরিচালিত হয়। বিশ্ব ব্যাংক, UNDP ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সুশাসনকে টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) অনুযায়ী সুশাসনের ৮টি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
সকল স্তরের জনগণ — বিশেষ করে নারী, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী — সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। অংশগ্রহণ প্রত্যক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক হতে পারে।
আইনের চোখে সকলেই সমান। আইন সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে সুশাসন সম্ভব নয়।
সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারণ ও বাজেট বরাদ্দ স্বচ্ছ হতে হবে।
সরকার ও সরকারি কর্মকর্তারা তাদের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকবেন। কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে হবে। সরকার, সংসদ ও বিচার বিভাগ — সবাই জবাবদিহির আওতাভুক্ত।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সকল পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সম্মতি ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ।
সকল নাগরিক — ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, সম্পদ নির্বিশেষে — সরকারি সেবা ও সুযোগ সমানভাবে পাবে। প্রান্তিক ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি সেবা ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সময়মতো ও গুণগত মান বজায় রেখে সেবা প্রদান করবে। সম্পদের অপচয় রোধ করতে হবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ জনগণের চাহিদা ও অভিযোগের প্রতি দ্রুত ও কার্যকরভাবে সাড়া দেবে। জনগণের অভিযোগ শোনা, সমাধান ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন: সরকারের প্রকারভেদ, চার মূলনীতি, সংবিধানের বৈশিষ্ট্য, সরকারের তিন অঙ্গের কাজ, স্থানীয় সরকার স্তর, সুশাসনের বৈশিষ্ট্য।
এককেন্দ্রিক বনাম যুক্তরাষ্ট্রীয়, সংসদীয় বনাম রাষ্ট্রপতি শাসিত, সরকারের তিন অঙ্গ, স্থানীয় সরকার কাঠামো, সুশাসনের ৮ বৈশিষ্ট্য।
উদ্দীপক বিশ্লেষণে সরকারের ধরন চিহ্নিত করা, সংবিধানের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা, অঙ্গসমূহের কাজ ও সম্পর্ক বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশ কোন ধরনের সরকার ব্যবস্থা অনুসরণ করে?
ক) যুক্তরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় খ) এককেন্দ্রিক ও সংসদীয় গ) যুক্তরাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত ঘ) এককেন্দ্রিক ও রাষ্ট্রপতি শাসিতবাংলাদেশের সংবিধানের কতটি অনুচ্ছেদ আছে?
ক) ১৪২টি খ) ১৫৩টি গ) ১৬৫টি ঘ) ১১টিবাংলাদেশের সরকারপ্রধান কে?
ক) রাষ্ট্রপতি খ) প্রধানমন্ত্রী গ) স্পিকার ঘ) প্রধান বিচারপতিসংবিধানের কতটি মূলনীতি আছে?
ক) ২টি খ) ৩টি গ) ৪টি ঘ) ৫টিজাতীয় সংসদের মোট আসন সংখ্যা কত?
ক) ৩০০ খ) ৩২৫ গ) ৩৫০ ঘ) ৪০০স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তর কোনটি?
ক) উপজেলা পরিষদ খ) ইউনিয়ন পরিষদ গ) জেলা পরিষদ ঘ) সিটি কর্পোরেশনসুশাসনের বৈশিষ্ট্য নয় কোনটি?
ক) স্বচ্ছতা খ) জবাবদিহিতা গ) গোপনীয়তা ঘ) অংশগ্রহণকোন সালের সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ১৯৭৫ খ) ১৯৮২ গ) ১৯৯১ ঘ) ১৯৯৬উদ্দীপক: জনাব রহিম একজন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি তার এলাকার উন্নয়ন নিয়ে একটি সভায় বললেন, "আমাদের দেশে সরকার পরিচালনার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো রয়েছে। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ — আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ — নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। সম্প্রতি সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর জন্য ই-গভর্নেন্স চালু করা হয়েছে। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এখনও অনেক পথ বাকি। স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জেলা পরিষদ পর্যন্ত সব স্তরকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।"