উত্তর: কোনো দখলদার শক্তি কর্তৃক অন্য কোনো দেশ দখল করে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস না করে, শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থে শাসন ও শোষণ কায়েম করাকে ঔপনিবেশিক শাসন বলে।
উত্তর: দিল্লির মুসলিম সুলতানদের আমলে বাংলার প্রশাসনিক বিভাগ বা প্রদেশসমূহকে ফারসি ভাষায় 'ইকলিম' বলা হতো।
উত্তর: শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় দীর্ঘকাল (সপ্তম-অষ্টম শতকে) যে তীব্র অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও আইনহীন পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তাকে 'মাৎস্যন্যায়' বলা হয়।
উত্তর: ঢাকার প্রাচীন নাম 'জাহাঙ্গীরনগর'।
উত্তর: ইংরেজদের অতিরিক্ত কর আরোপ এবং অনাবৃষ্টির ফলে বাংলা ১১৭৬ সনে (ইংরেজি ১৭৭০ সালে) বাংলায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষপীড়িত মড়ক দেখা দিয়েছিল, তাকে ইতিহাসে 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' বলা হয়।
উত্তর: ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামের বণিক দলের মাধ্যমে পরিচালিত শাসনব্যবস্থাকে কোম্পানি শাসন বলা হয়।
উত্তর: ১৩৩৮ সালে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ সোনারগাঁয়ে স্বাধীন সুলতানি যুগের সূচনা করেন।
উত্তর: আলীবর্দী খাঁ ১৭৫৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
উত্তর: ১৭৮০ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
উত্তর: ১৬০০ সালে ইংল্যান্ডে 'ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' স্থাপিত হয়।
উত্তর: নবাব সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২২ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন।
উত্তর: ভারতে প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন লর্ড ক্যানিং।
উত্তর: সেন বংশের শাসকেরা মূলত দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে বাংলায় এসেছিলেন।
উত্তর: ১৫৩৮ সালে বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে।
উত্তর: নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন 'পলাশীর যুদ্ধে' পরাজিত হন।
উত্তর: ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করেন।
উত্তর: উইলিয়াম হেজেজ ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গভর্নর বা প্রতিনিধি যিনি ১৬৮২ সালে বাংলায় আসেন।
উত্তর: ব্রিটিশ পার্লামেন্টে 'ভারত শাসন আইন' পাস হয় ১৮৫৮ সালে।
উত্তর: ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ ১৩৩৮ সালে স্বাধীন সুলতানি যুগ প্রতিষ্ঠা করেন।
উত্তর: পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা ১৪৯৮ সালে ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছেন।
উত্তর: ভাস্কো-দা-গামা পর্তুগালের নাবিক ছিলেন।
উত্তর: মোঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি ছিলেন মানসিংহ।
উত্তর: কোনো শক্তিশালী দেশ যখন অন্য কোনো দুর্বল দেশের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে শাসন ও শোষণ চালায়, তাকে ঔপনিবেশিক শাসন বলে। এ ধরনের শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—শাসক গোষ্ঠী বিজিত দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে না এবং সে দেশের অর্থ ও সম্পদ নিজেদের দেশে পাচার করে। এদেশের ইতিহাসে ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
উত্তর: প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষ ছিল মসলা, সুতি কাপড়, রেশম এবং নানা মূল্যবান সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ইউরোপের দেশগুলোতে ভারতীয় সুতি কাপড় ও মসলার ব্যাপক চাহিদা ছিল। এছাড়া এখানকার সস্তা শ্রম ও সুলভ কাঁচামাল ব্যবহার করে অধিক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব ছিল। এই বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও সম্পদের প্রাচুর্যের কারণেই ইউরোপীয় বণিকদের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতবর্ষ।
উত্তর: ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ বাংলায় যে শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তাকে দ্বৈতশাসন বলা হয়। এই ব্যবস্থায় বাংলায় একই সাথে দুটি কর্তৃত্ব বা শাসন বজায় ছিল। নবাবের হাতে ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও বেসামরিক প্রশাসনের নামমাত্র দায়িত্ব (ক্ষমতাহীন দায়িত্ব), আর অন্যদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ছিল রাজস্ব আদায় ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত ক্ষমতা (দায়িত্বহীন ক্ষমতা)।
উত্তর: উনিশ শতকে বাংলায় মুদ্রণযন্ত্র বা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার ফলে বইপুস্তক, সংবাদপত্র ও সাময়িকী সাধারণ মানুষের কাছে খুব সস্তায় ও সহজে পৌঁছানো সম্ভব হয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটে, কুসংস্কারের অন্ধকার দূর হয় এবং মানুষ যৌক্তিক ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে। এভাবেই দেশপ্রেম ও আত্মসচেতনতার বিকাশ ঘটিয়ে মুদ্রণযন্ত্র বাংলায় নবজাগরণ সৃষ্টিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
উত্তর: ব্রিটিশ শাসন আমলে বাংলার মানুষের ওপর নির্মম অর্থনৈতিক শোষণ চালানো হয়। কুটির শিল্প ধ্বংস, জোরপূর্বক নীল চাষ এবং অতিরিক্ত করের চাপে বাংলার সাধারণ মানুষ ও কৃষকেরা নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এছাড়া ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হলেও কোম্পানি কর মওকুফ করেনি। এই চরম অমানবিকতা, বৈষম্য এবং দাসত্বের শৃঙ্খলের কারণে বাংলার মানুষ ব্রিটিশদের শাসন পছন্দ করেনি।
উত্তর: ১৬৪৮ সালে ইউরোপে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে চলা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি করা হয়েছিল। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা, ধর্মীয় সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি স্থায়ী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা।
উত্তর: ১৮২১ সালে শ্রীরামপুরে মুদ্রণযন্ত্র বা ছাপাখানা স্থাপনের ফলে বাংলায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক, সংবাদপত্র ও সাহিত্যকর্ম স্বল্পমূল্যে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। এটি জ্ঞানচর্চার ধারাকে গতিশীল করে এবং সমাজে কুসংস্কার দূর করে মানুষের মধ্যে আধুনিক নাগরিক চেতনার উন্মেষ ঘটায়।
উত্তর: এদেশের মানুষের জন্য লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত 'দ্বৈতশাসন' ছিল চরম অভিশাপস্বরূপ। এই ব্যবস্থার ফলে কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের অবাধ ক্ষমতা পেয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে কর আদায় শুরু করে। এর ফলে ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে (বাংলা ১১৭৬) বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে মারা যায়।
উত্তর: দ্বৈতশাসন প্রবর্তনের ফলে বাংলার শাসনক্ষমতা বিভক্ত হয়ে পড়ে। নবাবের ওপর দেশরক্ষা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থাকলেও তা পালনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ক্ষমতা তথা রাজস্ব আদায়ের অধিকার ছিল কোম্পানির হাতে। ফলে রাজ্য শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য নবাবকে সম্পূর্ণভাবে কোম্পানির করুণার ওপর নির্ভর করতে হতো। নিজের কোনো সৈন্যদল বা নিজস্ব তহবিল না থাকায় নবাব কার্যত পুরোপুরি ক্ষমতাহীন পুতুলে পরিণত হন।
উত্তর: দিল্লির মুসলিম সুলতানদের আমলে বাংলার এক একটি প্রশাসনিক বিভাগ বা প্রদেশকে ফারসি ভাষায় 'ইকলিম' বলা হতো।
উত্তর: ১৬৪৮ সালে ইউরোপে দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে চলা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি করা হয়েছিল। এই চুক্তির ফলে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব স্বীকার এবং শান্তিতে সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হয়।
উত্তর: উদ্দীপকের 'তথ্য-১' দ্বারা বাংলায় ইংরেজদের 'ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা'-কে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বিজিত অঞ্চলের সম্পদ দখলদার শক্তি কর্তৃক নিজেদের স্বার্থে নিজ দেশে পাচার করাই হলো ঔপনিবেশিক শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য। বাংলায় ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৯০ বছর (প্রায় দুইশত বছর) এই শাসন বলবৎ ছিল।
উদ্দীপকের তথ্য-১-এ প্রায় ২০০ বছরের শাসনকাল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, মুদ্রণযন্ত্রের ব্যবহার এবং এদেশের অর্থসম্পদ অন্য দেশে পাচারের কথা বলা হয়েছে। ব্রিটিশ শাসন আমলে এদেশ থেকে প্রচুর ধন-সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করা হয়। তবে শাসনকাজ পরিচালনা ও নিজেদের স্বার্থেই তারা এদেশে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা (যেমন- ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা) এবং মুদ্রণযন্ত্রের প্রসারে অবদান রাখে। উদ্দীপকের এই বিবরণটি সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলের বৈচিত্র্যময় ঐতিহাসিক সত্যকে নির্দেশ করে।
উত্তর: হ্যাঁ, আমি মনে করি তথ্য-২-এ বর্ণিত সমাজ সংস্কারকদের অবদান বাংলার মানুষের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধিকার চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল।
উনিশ শতকে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও প্রমুখ সমাজ সংস্কারকের হাত ধরে বাংলায় এক অভূতপূর্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটে, যা 'বাংলার নবজাগরণ' নামে পরিচিত। উদ্দীপকের তথ্য-২-এ তৎকালীন কুসংস্কার দূরীকরণ এবং সমাজ সংস্কারকদের এই অবদানের কথাই বলা হয়েছে।
তৎকালীন হিন্দু সমাজের সতীদাহ প্রথার মতো নিষ্ঠুর সামাজিক কুসংস্কার উচ্ছেদ, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন এবং নারী শিক্ষার বিস্তারের ফলে সাধারণ মানুষের চিন্তাজগতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পাশ্চাত্য শিক্ষার সংস্পর্শে এসে বাঙালি সমাজ মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে আধুনিক ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করে। এই যুক্তিবাদী মনন মানুষকে কেবল সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধেই সচেতন করেনি, বরং নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সম্পর্কেও সজাগ করে তোলে।
সুতরাং বলা যায়, সমাজ সংস্কারকদের সমাজ সচেতনতামূলক আন্দোলনই পরোক্ষভাবে বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার সচেতনতা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ত্বরান্বিত করেছিল।
উত্তর: রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় দীর্ঘকাল (সপ্তম থেকে অষ্টম শতক পর্যন্ত প্রায় একশ বছর) যে চরম অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও আইনহীন পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তাকে বাংলার ইতিহাসে 'মাৎস্যন্যায়' বলা হয়।
উত্তর: ব্রিটিশ শাসন ছিল চরম অর্থনৈতিক শোষণ, লুণ্ঠন ও বৈষম্যে ভরা। তাদের একচেটিয়া বাণিজ্যিক নীতি এদেশের তাঁত ও কুটির শিল্প ধ্বংস করে দেয় এবং কৃষকদের ওপর অন্যায্য কর আরোপ করে। অতিরিক্ত করের চাপ ও শোষণের কারণে বাংলার মানুষ চরম দরিদ্র ও দুর্ভিক্ষপীড়িত হয়ে পড়ে। এ কারণেই বাংলার মানুষ ব্রিটিশদের শাসন পছন্দ করেনি।
উত্তর: উদ্দীপকের রহমতগঞ্জ ব্যবসায়ীদের বিষয়টি আমাদের পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত 'ইউরোপীয় বণিকদের আগমন এবং বাংলায় বাণিজ্য বিস্তার'-এর দিকটিকে নির্দেশ করে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার, ফরাসি এবং ইংরেজ বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বাংলায় আগমন করে। প্রথম দিকে তারা শান্ত বণিক হিসেবে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে ব্যবসা শুরু করলেও পরবর্তীতে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত চতুর উপায়ে ক্ষমতার লোভী হয়ে ওঠে।
উদ্দীপকের জনাব হাবাস ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা যেভাবে রহমতগঞ্জে বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ দেখে ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তা ইউরোপীয় বণিকদের বাংলায় আগমনের সমতুল্য। পরবর্তীতে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিরা যেভাবে শাসনকাজে হস্তক্ষেপ করে এবং নবাবকে পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করে, ঠিক সেভাবেই উদ্দীপকে গিবসন রহমতগঞ্জের চেয়ারম্যানের কাজে হস্তক্ষেপ করে একপর্যায়ে ক্ষমতা দখল করে নেয়। সুতরাং, এই ঘটনাটি বাংলায় ইউরোপীয় বণিকদের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে তুলে ধরে।
উত্তর: উদ্দীপকের জনাব গিবসনের কাজের সাথে পাঠ্যবইয়ের 'ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতা দখল এবং ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা'র মিল রয়েছে। বাংলায় এই ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও বহুমুখী।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলার ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে নেয়। এরপর ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে তারা বাংলায় কর আদায়ের নিরঙ্কুশ অধিকার পায়। এই ক্ষমতা দখলের প্রভাব বাংলার ইতিহাসে নিম্নোক্তভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল:
১. অর্থনৈতিক প্রভাব: ব্রিটিশরা বাংলার অফুরন্ত সম্পদ নিজ দেশে পাচার করে। তাদের অতিরিক্ত কর নীতি ও শোষণের ফলে ১৭৭০ সালে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' নামে পরিচিত। এতে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। এদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়।
২. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব: শাসন সহজ করার লক্ষ্যে ব্রিটিশরা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচলন করে। এর ফলে ইংরেজি শিক্ষিত এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়। এই শ্রেণির হাত ধরেই উনিশ শতকে বাংলায় সামাজিক সংস্কার ও নবজাগরণ ঘটে।
৩. প্রশাসনিক পরিবর্তন: ১৭৮৪ ও ১৮৫৮ সালের আইনের মাধ্যমে বাংলার দীর্ঘদিনের শাসন কাঠামো বিলুপ্ত করে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অধীনে প্রত্যক্ষ শাসন চালু করা হয়। রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ এবং ডাক ব্যবস্থার মতো আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়।
অতএব, জনাব গিবসনের মতো কূটকৌশলে ক্ষমতা দখলের পর বাংলায় যে ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হয়েছিল, তা একদিকে যেমন বাংলার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল, অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার সংস্পর্শে বাঙালির আধুনিক জাতিসত্তা ও স্বাধীনতার চেতনা বিকাশেও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিল।
উত্তর: রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর সপ্তম-অষ্টম শতকে বাংলায় দীর্ঘ একশ বছর ধরে যে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল, তাকে 'মাৎস্যন্যায়' বলে।
উত্তর: মুদ্রণযন্ত্র বা ছাপাখানা আবিষ্কারের ফলে বাংলায় সস্তায় বইপুস্তক, সাময়িকী ও সংবাদপত্র ছাপা শুরু হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞানচর্চার দ্রুত বিস্তার ঘটে, মানুষ কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে যৌক্তিক চিন্তা করতে শেখে এবং নিজেদের অধিকার ও দেশপ্রেম সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এভাবে মুদ্রণযন্ত্র বাংলায় নবজাগরণ সৃষ্টিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
উত্তর: উদ্দীপকে বর্ণিত 'ক' দেশের ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম পাঠ্যবইয়ে উল্লিখিত 'ইংরেজ বণিকদের বাংলায় আগমন ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল'-এর বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে।
শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলোর উৎপাদিত পণ্য বিক্রয় এবং কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য নতুন বাজারের প্রয়োজন হয়। এই উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করতে আসে। বাংলার উর্বর ভূমি এবং অফুরন্ত সম্পদের কারণে তারা এদেশকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। প্রথম দিকে তারা শান্ত বণিক হিসেবে ব্যবসা করলেও পরবর্তীতে দেশীয় রাজন্যবর্গের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করে।
উদ্দীপকের 'ক' দেশটি শিল্পোন্নত এবং এর ব্যবসায়ীরা 'খ' দেশে বাণিজ্য করতে গিয়ে এক পর্যায়ে স্থানীয় কিছু মানুষের সহায়তায় ক্ষমতা দখল করে। এটি হুবহু ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে মীর জাফর ও জগৎশেঠদের মতো দেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় লর্ড ক্লাইভ ও ইংরেজ কোম্পানির ক্ষমতা দখলের ঐতিহাসিক সত্যকে ফুটিয়ে তোলে।
উত্তর: উদ্দীপকের দৃশ্যকল্প-২-এ বর্ণিত বিষয়টি বাংলার ইতিহাসে লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত 'দ্বৈত শাসনব্যবস্থা'-কে নির্দেশ করে, যা বাংলার মানুষের জন্য একটি চরম অভিশাপ ছিল।
১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভ করেন। এর ফলে বাংলায় এক অদ্ভুত শাসনব্যবস্থার জন্ম হয়, যা 'দ্বৈত শাসন' নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় নবাবের হাতে রইল দেশরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলার মতো ক্ষমতাহীন দায়িত্ব, আর ইংরেজদের হাতে রইল রাজস্ব আদায় ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা। অর্থাৎ ইংরেজরা পেল দায়িত্বহীন ক্ষমতা এবং নবাব পেলেন ক্ষমতাহীন দায়িত্ব।
এই দ্বৈত শাসনের ফলে বাংলার মানুষের ওপর যে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল:
১. রাজস্বের অতিরিক্ত চাপ: ইংরেজ কর্মচারীরা কর আদায়ের জন্য কৃষকদের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করে। অতিরিক্ত করের চাপে কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে।
২. উৎপাদন ব্যাহত ও দুর্ভিক্ষ: করের খড়্গ ও অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টির ফলে দেশে শস্য উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হয়। ১৭৭০ সালে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' নামে পরিচিত।
৩. মানবিক বিপর্যয়: এই দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার জ্বালায় বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় এক কোটি) মানুষ মারা যায়। অথচ কোম্পানি কর মওকুফ না করে কঠোরভাবে তা আদায় অব্যাহত রেখেছিল।
সুতরাং, দায়িত্বহীন ও চরম লোভী শাসন কাঠামোর কারণে সৃষ্ট দ্বৈত শাসনব্যবস্থা এবং এর পরবর্তী দুর্ভিক্ষ বাংলার জনজীবনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল। তাই বলা যায়, এই বিষয়টি বাংলার মানুষের জন্য এক চরম অভিশাপ ছিল।
উত্তর: দিল্লির মুসলিম সুলতানদের আমলে বাংলার প্রশাসনিক বিভাগ বা প্রদেশগুলোকে ফারসি ভাষায় 'ইকলিম' বলা হতো।
উত্তর: এদেশের মানুষের জন্য লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত 'দ্বৈত শাসন' (১৭৬৫-১৭৭২) ছিল চরম অভিশাপস্বরূপ। কারণ এই ব্যবস্থার ফলে ইংরেজরা দায়িত্বহীনভাবে কর আদায়ের সীমাহীন ক্ষমতা পায়, যা সাধারণ মানুষকে শোষণের চরম সীমায় নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মতো ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে।
উত্তর: রাকিবের দেখা চলচ্চিত্রটির সাথে আমার পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত 'পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ)' এবং 'নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের' ঐতিহাসিক ঘটনার মিল রয়েছে।
১৭৫৬ সালে আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর মাত্র ২২ বছর বয়সে তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। তরুণ নবাবের অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাঁর খালা ঘসেটি বেগম, সেনাপতি মীর জাফর আলী খান এবং প্রভাবশালী বণিক জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ ও উমিচাঁদেরা এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা ইংরেজ বণিকদের সাথে হাত মেলায়।
১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাবের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধ বাঁধে। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নবাবের বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে তারা নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকে এবং নবাবের পরাজয় ঘটে। উদ্দীপকের চলচ্চিত্রের সেনাপতি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কুচক্র এবং বিদেশি শক্তির সহায়তায় পরাজয়ের বিষয়টি মূলত পলাশীর যুদ্ধে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার করুণ পতনকেই নির্দেশ করে।
উত্তর: উদ্দীপকের 'অন্য দেশের বাণিজ্যিক গোষ্ঠী' বলতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বোঝানো হয়েছে। বাংলায় তাদের দীর্ঘ ১৯০ বছরের শাসনের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, যার মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই বিদ্যমান।
নেতিবাচক প্রভাব:
১. অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও শিল্প ধ্বংস: ব্রিটিশরা বাংলার দেওয়ানি লাভ করে এদেশের সম্পদ অবাধে ইংল্যান্ডে পাচার করে। তাদের একচেটিয়া বাণিজ্য নীতির কারণে বাংলার সমৃদ্ধ মসলিনসহ তাঁত ও কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়।
২. কৃষি বিপর্যয়: কৃষকদের ওপর জোরপূর্বক নীল চাষ চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং অন্যায্য খাজনা আদায় করা হয়। এর ফলে বাংলার কৃষক শ্রেণি চরম দরিদ্র ও ভূমিহীন মজুরে পরিণত হয়।
৩. বিভাজন ও শাসন নীতি: নিজেদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে তারা হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ বা 'ভাগ কর এবং শাসন কর' (Divide and Rule) নীতি প্রয়োগ করে, যা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম দেয়।
ইতিবাচক প্রভাব (পরোক্ষ সুফল):
১. আধুনিক শিক্ষার বিস্তার: শাসনকাজের সুবিধার্থে ব্রিটিশরা ইংরেজি শিক্ষা চালু করে। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ও অন্যান্যদের প্রচেষ্টায় আধুনিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে।
২. সামাজিক সংস্কার: পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে কুসংস্কার দূরীকরণে সতিদাহ প্রথা রদ ও বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়, যা সমাজ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
৩. যোগাযোগ ও অবকাঠামো: রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ ও ডাক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের ফলে দেশের অভ্যন্তরে যোগাযোগ সহজ হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ব্রিটিশ বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য শোষণ হলেও তাদের পরোক্ষ প্রভাবে বাংলায় আধুনিক শিক্ষা ও চেতনার উন্মেষ ঘটে, যা পরবর্তীকালে স্বাধিকার আন্দোলনের রূপ নেয়।
উত্তর: ১৬৪৮ সালে ইউরোপে যুদ্ধরত বিভিন্ন দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাকে 'ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি' বলে।
উত্তর: লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈত শাসনের ফলে কর আদায় ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা চলে যায় ইংরেজ কোম্পানির হাতে, আর নবাবের ওপর অর্পিত হয় শুধু শাসন ও বিচারব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব। কিন্তু সৈন্য পরিচালনা ও প্রশাসনিক কাজের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, তা আদায়ের কোনো অধিকার নবাবের ছিল না। অর্থের জন্য নবাবকে সম্পূর্ণভাবে কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হতো। ফলে ক্ষমতার কোনো উৎস না থাকায় নবাব কার্যত সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন।
উত্তর: উদ্দীপকের অনুচ্ছেদ-১-এ বর্ণিত ঘটনার সাথে আমাদের পাঠ্যপুস্তকের 'নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও পতন'-এর মিল রয়েছে।
১৭৫৬ সালে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হওয়ার পর থেকেই তাঁর আপন খালা ঘসেটি বেগম, সেনাপতি মীর জাফর এবং ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভ তাঁর চরম শত্রু হয়ে ওঠেন। নবাবের কাছের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও মীর জাফর ব্যক্তিগত লোভ ও ক্ষমতার লালসায় ইংরেজদের সাথে গোপন চুক্তি করেন।
উদ্দীপকের অনুচ্ছেদ-১-এ বলা হয়েছে, জনপ্রতিনিধি 'খ' নির্বাচিত হওয়ার পর ঘরের ও বাইরের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এটি নবাব সিরাজউদ্দৌলার জীবনের ট্র্যাজেডির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। নবাব সিরাজউদ্দৌলাও সিংহাসনে বসার পর আপনজনদের চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও ইংরেজদের মিলিত ষড়যন্ত্রে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন এবং মীর জাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।
উত্তর: উদ্দীপকের অনুচ্ছেদ-২-এ বর্ণিত শিক্ষার বিস্তার এবং এর ফলে মানুষের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন করার বিষয়টি মূলত উনিশ শতকের 'বাংলার নবজাগরণ' (Bengal Renaissance)-কে নির্দেশ করে। এই উক্তিটি সম্পূর্ণ যথার্থ।
১৮ শতকের শেষভাগ থেকে ইংরেজরা বাংলায় তাদের শাসন টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চালু করে। ১৮২১ সালে শ্রীরামপুরে মুদ্রণযন্ত্র স্থাপনের ফলে জ্ঞানচর্চার গতি বৃদ্ধি পায়। ছাপা বই ও সংবাদপত্র সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে যায়।
পাশ্চাত্য শিক্ষার ছোঁয়ায় বাংলার সমাজ সংস্কারকদের হাত ধরে মানুষের চিন্তাজগতে বিপুল পরিবর্তন আসে:
১. যুক্তিবাদী মনন: শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে মানুষ যৌক্তিক প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।
২. সামাজিক সংস্কার: সতীদাহ প্রথার মতো অমানবিক প্রথা উচ্ছেদ এবং নারী শিক্ষার প্রসারে জোয়ার আসে। হিন্দু কলেজের তরুণ শিক্ষার্থীরা (Young Bengal) যুক্তির আলোয় সমাজকে দেখতে শুরু করে।
৩. দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের উন্মেষ: শিক্ষিত সমাজ কেবল ধর্মীয় কুসংস্কারই দূর করেনি, বরং তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এই আধুনিক চেতনার সূত্র ধরেই পরবর্তীকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধিকার চেতনার জন্ম নেয়।
সুতরাং, অনুচ্ছেদ-২-এ যেভাবে শিক্ষার প্রসারে মানুষের মধ্যে চেতনা সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, ঠিক একইভাবে উনিশ শতকের শিক্ষাদীক্ষার প্রসার বাংলার মানুষের মধ্যযুগীয় জড়তা ভেঙে এক নতুন আধুনিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দিয়েছিল।
উত্তর: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—বিজিত অঞ্চলের সম্পদ দখলদার শক্তি কর্তৃক নিজেদের স্বার্থে নিজ দেশে পাচার করা।
উত্তর: ১৮২১ সালে শ্রীরামপুরে মুদ্রণযন্ত্র বা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলায় শিক্ষা ও সাহিত্য চর্চায় এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে। স্বল্প মূল্যে পাঠ্যবই, সংবাদপত্র ও সাময়িকী ছাপা সম্ভব থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে কুসংস্কার দূর হতে থাকে এবং মানুষের মধ্যে আধুনিক ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটে, যা বাংলার নবজাগরণে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
উত্তর: উদ্দীপকে নির্দেশিত ঘটনার সাথে ১৭৫৭ সালের 'পলাশীর যুদ্ধ' এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মিল রয়েছে।
নবাব আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা আমেনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। আলীবর্দী খাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা ঘসেটি বেগম আশা করেছিলেন তাঁর পালক পুত্র সিংহাসন পাবেন। কিন্তু সিরাজ নবাব হওয়ায় ঘসেটি বেগম এবং তাঁর সহযোগী রাজবল্লভ, মীর জাফর প্রমুখ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার লোভে তাঁরা ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, জমিদারের মৃত্যুর পর ছোট মেয়ের ছেলেকে জমিদারি দেওয়ায় বড় মেয়ে ও কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে কোন্দল সৃষ্টি করে এবং অবশেষে এক বিদেশি কোম্পানির হাতে ক্ষমতা চলে যায়। এই পারিবারিক কোন্দল ও ষড়যন্ত্রের চিত্রটি হুবহু নবাব সিরাজউদ্দৌলার পারিবারিক কোন্দল ও মীর জাফরদের বিশ্বাসঘাতকতার ঐতিহাসিক ঘটনাকে প্রতিফলিত করে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলার স্বাধীনতা হারানো।
উত্তর: উদ্দীপকে নির্দেশিত কোম্পানি অর্থাৎ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন আমলে তারা তাদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সুবিধার্থে এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল যা বাংলায় তাদের আধিপত্যকে সুদৃঢ় করেছিল।
১. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩): লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করে এক নতুন অনুগত জমিদার শ্রেণি তৈরি করেন। এই জমিদার শ্রেণি নিজেদের স্বার্থেই বাংলায় ব্রিটিশ শাসন টিকিয়ে রাখতে কোম্পানিকে সর্বাত্মক সহায়তা করত।
২. যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ: লর্ড ডালহৌসি রেলপথ, টেলিগ্রাফ এবং ডাক ব্যবস্থার প্রচলন করেন। বাহ্যিকভাবে এটি জনকল্যাণমূলক মনে হলেও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত সৈন্য পাঠানো এবং এদেশের কাঁচামাল সহজে বন্দরে নিয়ে যাওয়া, যা কোম্পানির শাসনকে আরও শক্তিশালী করে।
৩. পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন: ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে তারা এমন এক কেরানি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছিল যারা রক্তে-বর্ণে ভারতীয় হলেও চিন্তায় হবে ব্রিটিশপন্থী। এটি কোম্পানির প্রশাসনিক কাজকে সহজ ও দীর্ঘস্থায়ী করেছিল।
৪. আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার পুনর্গঠন: কোম্পানির অনুকূলে আইন প্রণয়ন করে তারা স্থানীয় প্রতিরোধগুলো কঠোরভাবে দমন করে।
অতএব বলা যায়, কোম্পানির গৃহীত সংস্কারমূলক কাজগুলো মূলত তাদের নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং এদেশীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল, যা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল।
উত্তর: সেন বংশের শাসকেরা মূলত দক্ষিণ ভারতের দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে বাংলায় এসেছিলেন।
উত্তর: দিল্লির সুলতানদের আমলে বাংলাকে শাসনকার্যের সুবিধার্থে কয়েকটি প্রশাসনিক অঞ্চল বা বিভাগে ভাগ করা হয়েছিল। এই বিভাগগুলোকে ফারসি ভাষায় 'ইকলিম' বলা হতো। ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের সময়ে সোনারগাঁ, সাতগাঁ ও লখনৌতি—এই তিনটি প্রধান ইকলিম বা বিভাগ বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসনের গোড়াপত্তন করে।
উত্তর: ছক-১-এ উল্লিখিত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বাংলার ইতিহাসে 'আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ও বাংলার নবজাগরণ'-এর ঘটনাকে প্রতিফলিত করে।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে এদেশের শাসন ও দাপ্তরিক কাজ চালানোর সুবিধার্থে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর ফলে ১৮১৬ সালে হিন্দু কলেজ, ১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ এবং ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠার ফলে বাঙালি সমাজ মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে যুক্তি ও বিজ্ঞানের পথে হাঁটা শুরু করে। নবশিক্ষিত এই তরুণদের হাত ধরেই বাংলায় আধুনিক সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়। সুতরাং, ছক-১ এর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এদেশীয় আধুনিক রূপান্তরের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
উত্তর: ছক-২-এ উল্লিখিত 'স্বদেশি আন্দোলন', 'অসহযোগ আন্দোলন' এবং 'সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন' বাংলার তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছিল।
১. স্বদেশি আন্দোলন: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে এই আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। বিদেশি পণ্য বর্জন এবং দেশি পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে বাঙালিরা ব্রিটিশ অর্থনীতিতে আঘাত হানে। এটি এদেশের মানুষের মনে তীব্র দেশপ্রেম ও আত্মনির্ভরশীলতার জন্ম দেয়।
২. অসহযোগ আন্দোলন: মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ১৯২০-এর দশকে এই অহিংস আন্দোলন শুরু হয়। ব্রিটিশদের সমস্ত আইন ও শাসনযন্ত্রকে অচল করে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারি চাকরি, স্কুল-কলেজ ও আদালত বর্জনের ডাক দেওয়া হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণ স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়।
৩. সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন: ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার প্রমুখ বিপ্লবীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সশস্ত্র প্রতিরোধ ব্রিটিশ শাসকদের মনে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। তাঁরা জীবন উৎসর্গ করে প্রমাণ করেছিলেন যে বাঙালিরা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে মৃত্যুকেও ভয় পায় না।
এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও বিপ্লবী আন্দোলনের চাপে পড়ে অবশেষে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা এদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। তাই বলা যায়, ছক-২-এ বর্ণিত আন্দোলনগুলোই ধাপে ধাপে বাঙালিকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত সোপানে নিয়ে গিয়েছিল।